বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০২ অপরাহ্ন
নোটিশ :
আমাদের নিউজ সাইটে খবর প্রকাশের জন্য আপনার লিখা (তথ্য, ছবি ও ভিডিও) মেইল করুন onenewsdesk@gmail.com এই মেইলে।

হোসেনপুরে কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে হ্যাজাক লাইট

সঞ্জিত চন্দ্র শীল, হোসেনপুর, কিশোরগঞ্জ
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৫
  • ৯০ বার পড়া হয়েছে
সত্তর কিংবা আশি’র দশকে রাতের আঁধার আলোকিত করতে বিয়ে বাড়ি,ধর্মসভা, নাটক ,যাত্রাগানসহ গ্রামীণ বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে বড় পরিসরে আলোর একমাত্র উৎস ছিল ‘হ্যাজাক লাইট’। কালের বিবর্তন ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বৈদ্যুতিক সুবিধা বৃদ্ধির কারণে এটি আজ বিলুপ্ত প্রায়।
সূত্র মতে, পুরনো ঐতিহ্যবাহী আলো প্রদানকারী ওই হ্যাজাক লাইটের প্রকৃত নাম পেট্রোম্যাক্স হলেও গ্রামাঞ্চলে এটি ‘হ্যাজাক লাইট’ নামেই বেশি পরিচিত। মূলত: জার্মানারা ১৯১০ সালে পেট্রোম্যাক্স ল্যাম্প বা হ্যাজাক বাতি আবিষ্কার করেন। চলত কেরোসিন তেলের মাধ্যমে। আজ নতুন প্রজন্মের কাছে এটি অচেনা ও অজানা।
স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোঃ নবী হোসেন, মোঃ জুয়েল মেম্বারসহ অনেকেই জানান, এক সময় প্রত্যন্ত গ্রামবাংলার অনেক ঘরেই থাকতো এ হ্যাজাক লাইট। বাড়িতে ছোট-বড় যেকোনো অনুষ্ঠান হলে সকালবেলা থেকেই শুরু হতো দৌড়-ঝাপ। দিনভর চলতো হ্যাজাক লাইট জ্বালানোর প্রস্তুতি। কেননা সবাই এটিকে জ্বালাতে পারতো না। তাই এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে সেদিন পরম সমাদরে ডেকে আনা হতো। এই লাইট জ্বালানোর প্রস্তুতিটাও ছিল বেশ দেখার মতো । অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো তার কর্মযজ্ঞ।
বাড়ির কচি-কাচারা,এমনকি বড়রাও হ্যাজাক লাইট প্রজ্বলনের প্রস্তুতি দেখতে দাঁড়িয়ে থাকতো। হ্যাজাকে তেল আছে কিনা তিনি পরীক্ষা করেই শুরু করতেন সেটিতে পাম্প করা। তারপর হ্যাজাকের নব ঘুরিয়ে জ্বলন্ত কাঠি কিংবা কাগজ তার সংস্পর্শে আনতেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠতো। এরপর ক্রমেই হ্যাজাকের মাঝখানের ম্যান্টল থেকে বেশ উজ্জ্বল আলো বেরনো শুরু হতো যা দেখতে এখনকার বৈদ্যুতিক এলইডি বাল্বের আলোর মতো। সফলভাবে হ্যাজাক জ্বালানোর পর সেই ব্যক্তির চোখে মুখে ফুটে উঠত এক পরিতৃপ্তির হাসি। আর হ্যাজাকের সেই উজ্জ্বল আলোর ঝলকানিতে উপস্থিত কচি- কাচারাও চলে যেত এক আনন্দের জগতে। কিন্তু কালের বিবর্তনে ক্রমেই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাচীনতম আলোর বড় উৎস ওই হ্যাজাক লাইট।
প্রসঙ্গক্রমে,উপজেলার বাসুর চর এলাকার নাট্য ব্যক্তিত্ব মোঃ ফজলুল হক, দুলাল মিয়াসহ অনেকেই জানান, বিয়ে-শাদি, পূজা-পার্বণ, যাত্রাপালা, এমনকি ধর্ম সভায়ও ভাড়া দেওয়া হতো এই হ্যাজাক লাইট। এটি হ্যারিকেনের মতোই কিন্তু আকারে বেশ বড় ও ভিন্ন রকম। এটি জ্বলে পাম্প করে চালানোর ফলে । সাদা কেরোসিনের কুকারের মতোই কিন্তু চুলার বার্নারের বদলে এতে আছে ঝুলন্ত একটা সলতে। যেটা দেখতে প্রায় ১০০ ওয়াটের সাদা টাংস্টেন বাল্বের মতো। এটি অ্যাজবেস্টরে তৈরি। এটা পুরে ছাঁই হয়ে যায় না। পাম্প করা কেরোসিন তেল একটা নলের ভিতর দিয়ে গিয়ে স্প্রে করে ভিজিয়ে দেয় সলতেটাকে। এটা জ্বলে চেম্বারে যতক্ষণ তেল আর হাওয়ার চাপ থাকে। তেলের চেম্বারের চারিদিকে থাকে চারটি বোতাম। একটি পাম্পার,একটি অ্যাকশন রড, একটি হাওয়ার চাবি ও একটি অটো লাইটার। অ্যাকশন রডের কাজ হচ্ছে তেল বের হওয়ার মুখটা পরিষ্কার রাখা। হাওয়ার চাবি দিয়ে পাম্পারে পাম্প করা বাতাসের চাপ কমানো বা বাড়ানো হয়। একবার হাওয়া দিলে জ্বলতে থাকে কয়েক ঘন্টা। আর দেড় থেকে দুই লিটার তেলে জ্বলত প্রায় সারা রাত। তবে ২৫-৩০ বছর আগে হ্যাজাক লাইট এক রাতের জন্য ১০০-১৫০ টাকা করে ভাড়াও দেওয়া হতো।এটি চলতো জৈষ্ঠ থেকে ফাল্গুন মাস পর্য়ন্ত ।বর্ষার শুরুতে এবং শীতের শুরুতেই যখন নদী-নালায় পানি কমতে থাকে তখন রাতের বেলায় হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে অনেকে মাছ শিকারও করতেন।
স্থানীয় বৈদ্যুতিক লাইটিং বিশেষজ্ঞ মোঃ রিপন মিয়া জানান,এই হ্যাজাক লাইটের ব্যবহার অতি প্রাচীন। সাধারণ বাতি বলতে বুঝায় কুপি, টর্চ লাইট, হ্যারিকেন ইত্যাদি । কিন্তু হ্যাজাক বাতি হলো সেই সরঞ্জাম যা বড় পরিসরে অন্ধাকার দূর করতে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সবখানেই। ফিলামেন্ট বাতির বদলে এলইডি বাতি চলে এসেছে। পাশাপাশি এলইডির সঙ্গেও এখন যুক্ত হয়েছে নানা রকম প্রযুক্তির স্মার্ট বাতিও। তবে যুগের পরিবর্তনে হ্যাজাক লাইট আজ বিলুপ্ত ।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে,শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় এক মণ ধান পাওয়া যেমন বর্তমানে অবাক করার মতো ঘটনা,ঠিক তেমনি আগামীতে নতুন প্রজন্মের কাছে ওই হ্যাজাক লাইট হবে বিস্ময়কর বস্তুর মধ্যে অন্যতম।আর এটি খোঁজে পাওয়া যাবে হয়তো কোনো মিউজিয়ামে।

Tahmina Dental Care

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর

© All rights reserved © 2026 Onenews24bd.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com