আজ ১৯ জুলাই। কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার হাছলা গ্রামের মানুষের জন্য দিনটি গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণের। ২০২৪ সালের এই দিনে রাজধানীর মিরপুরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিহত হন তাড়াইল উপজেলার বীর শহীদ তরিকুল ইসলাম রুবেল। তাঁর শাহাদাৎবার্ষিকীর দুই বছর পূর্তিতে পরিবার, স্বজন, সহযোদ্ধা ও এলাকাবাসী গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করছেন।
শহীদ তরিকুল ইসলাম রুবেল তাড়াইল উপজেলার হাছলা গ্রামের বাসিন্দা এবং মো. ফরিদ উদ্দিনের ছেলে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সাহসী, কর্মঠ ও দায়িত্বশীল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতার জন্য তিনি সবার কাছে পরিচিত ছিলেন।
পরিবার ও সহযোদ্ধাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ আদায় শেষে প্রতিদিনের মতো রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে আন্দোলনে যোগ দেন রুবেল। তিনি আন্দোলনের সামনের সারিতে সক্রিয় ছিলেন। ওই দিন কারফিউ জারি থাকা অবস্থায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে তিনি মিরপুর-১৪ এলাকার ০১ বিল্ডিং জিরো পয়েন্ট, কাফরুল থানার সামনের দিকে অবস্থান নেন।
সহযোদ্ধাদের দাবি, সন্ধ্যার পর তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে সঙ্গে থাকা আন্দোলনকারীরা ঝুঁকি নিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।
স্বজনরা জানান, কারফিউর কারণে তাঁকে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেও চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া যায়নি। পরে মরদেহ গ্রামের বাড়ি তাড়াইলে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজধানীর অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে কোনো অ্যাম্বুলেন্স যেতে রাজি হচ্ছিল না।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাড়াইল উপজেলা বিএনপির সভাপতি সারওয়ার হোসেন লিটনের উদ্যোগে একাধিক অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হলেও পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে তাঁর সহযোগিতায় নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে শহীদ রুবেলের মরদেহ নিজ গ্রাম হাছলায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
পরদিন ২০ জুলাই শনিবার যোহরের নামাজের পর বেলংকা মুন্সী বাড়ি মাদরাসা মাঠে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে বেলংকা পঞ্চগ্রাম কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সীমিত পরিসরে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হয়েছিল।
তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি এবং শহীদ রুবেলের বড় ভাই ইফতেখারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, “২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আমার ভাই তরিকুল ইসলাম রুবেল আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হন। সেই দিনটি আমাদের পরিবারের জন্য চিরদিনের বেদনার দিন হয়ে আছে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ভাইকে হারানোর কষ্ট আজও বুকের ভেতর বহন করছি। আমরা চাই, মানুষ রুবেলকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখুক এবং মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।”
তিনি আরও বলেন, “রুবেল আমাদের পরিবারের শুধু একজন সদস্য ছিল না, সে ছিল আমাদের স্বপ্ন ও ভালোবাসার জায়গা। তার চলে যাওয়ার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।”
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শহীদ রুবেলের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি এবং পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে তারা আশাবাদী।
দুই বছর পরও হাছলা গ্রামের সেই বাড়িতে শোকের আবহ কাটেনি। পিতা মো. ফরিদ উদ্দিনের চোখে সন্তানের হারানোর বেদনা, ভাইয়ের কণ্ঠে আবেগ এবং স্বজনদের হৃদয়ে অপূরণীয় শূন্যতা আজও স্পষ্ট। পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস, রুবেলের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। তাঁর সাহস, দেশপ্রেম ও মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গের ঘটনা তাড়াইলসহ সমগ্র এলাকার মানুষের কাছে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।