কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পৌর এলাকার শম্ভুপুর গ্রামের বরবাড়ির দরিদ্র পরিবারের বড় ছেলে আল-আমিন (২৩)। বাবা সেলিম মিয়া পেশায় পিকআপ চালক। দুইভাই দুইবোন আর মা-বাবাকে নিয়ে আলআমিনের ছয় সদস্যের পরিবার।
জীবিকার তাগিদে গত আট বছর আগে সুদূর প্রবাসে পাড়ি জমান সংসারের বড় ছেলে আলআমিন। দীর্ঘবছর প্রবাসে থাকার সুবাদে ধীরে ধীরে আলআমিনের অস্বচ্ছল পরিবারটি স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করে। সাত বছরেরও অধিক সময়ের পর প্রবাসে থেকেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভৈরব উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের টানকৃশ্ননগর গ্রামের ফুল মিয়া মেম্বারের মেয়ে মারুফার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন প্রবাসী আলআমিন। এরপর কেটে যায় আরো ছয়মাস। পরবর্তীতে গত তেরদিন আগে দেশে এসে গেল ২০ডিসেম্বর শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয় আলআমিন-মারুফা দম্পতির।
বিয়ের দিন কনে নিয়ে ফিরে আসার আগ মুহূর্তে কনের বাবা-মাকে সালাম করবে বর এবং কনের বাবা-মা স্বর্ণের আংটি বা গলার চেইন উপহার দিয়ে আশীর্বাদ করবেন বরকে এমনটাই গ্রামে দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম। কিন্তু সেদিন আল আমিনের বিয়েতে এ নিয়মের বেত্যয় ঘটে। বর আলআমিন তার শশুর শাশুরিকে সালাম করলে আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে সালামী হিসেবে স্বর্ণের আংটি বা চেইন এর পরিবর্তে শাশুরির কাছ থেকে পেয়েছেন নগদ হাজার টাকার নোট আর শশুরের কাছ থেকে পেয়েছেন নগদ পাচঁশত টাকা। মোট দেড় হাজার টাকা সালামী পেয়ে নববধূ মারুফাকে নিয়ে হাসিমুখেই নিজগৃহে ফিরে আসেন আল আমিন। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে নিজের বাড়িতেই। স্বর্ণের বদলে ছেলে দেড় হাজার টাকা সালামী পেয়েছে এব্যাপারটি মেনে নিতে পারেননি আল আমিনের মা মর্জিনা বেগম। তাই বিয়ের প্রথমদিন থেকেই নববধু মারুফার সাথে আল আমিনের মায়ের মনমালিন্যের সূত্রপাত হয়।
পরবর্তীতে এই মনমালিন্যের ঘটনাটি তীব্রক্ষোভে পরিণত হয় শাশুরি মর্জিনা বেগমের। ফলে প্রতিনিয়তই ছেলের বউকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ বিভিন্ন কটুকথা বলতে থাকেন তিনি। এদিকে কোনো ভাবেই নিজের মাকে বিষয়টি বুঝিয়ে উঠতে পারছিলেন না ছেলে আল আমিন। শেষমেশ বিয়ের চতুর্থদিনের সূর্যের আলোতেই নিজেই নিজের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেন আল আমিন।
গতকাল মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে নিজ গৃহে নিজের নববধুর নতুন ওড়না পেচিয়ে আত্মহত্যা করেন আলআমিন। আজ বুধবার বিকেলে সরজমিনে গিয়ে নিহত আল আমিনের স্ত্রী ও নিকট আত্মীস্বজনদের মুখ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এঘটনায় চারদিনের মাথায় স্বামীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে এককভাবে শাশুরিকে দায়ী করছেন নববধু মারুফা। তিনি বলেন, “বিয়ের দিন থেকেই আমার শাশুরি ওই একটি আংটির জন্য আমাকে সারাক্ষণ গালিগালাজ করতো। আমার শাশুরি যখন আমার সাথে দূরব্যবহার করতো আমার স্বামী নিরুপায় হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো আর বলতো “কি করবো আমি, নিজের মাকে কিভাবে বুঝাবো, তুমি কেমনে বাকি জীবন সহ্য করবা”।
তিনি আরো বলেন, বিয়ের দিন আমার বাড়ি থেকে তিনভুরি স্বর্ণ দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু আমার বাবা-মা দুইভুরি স্বর্ণ বিয়েরদিন দিয়েছেন আর বাকি একভুরি স্বর্ণ দেড়মাস পরে দেওয়ার কথা ছিল। এরজন্যেও আমার শাশুরি আমাকে কটুকথা বলতেন। এমনকি বিয়ের দুইদিন পর আমার দুইভাই আমাকে ফিরাযাত্রাতে নিতে আসলে আমার শাশুরি তাদেরকে অপমান করে বের করে দেন। এছাড়াও নিজের বাবা-মায়ের অনুমতি পেলে এঘটনায় বিচার চেয়ে মামলাও করবেন বলে জানিয়েছেন স্বামীহারা মারুফা।
এদিকে ছেলের এমন মৃত্যুতে কাউকেই দায়ী করতে রাজি নন নিহত আলআমিনের বাবা সেলিম মিয়া ও মা মর্জিনা বেগম। বাবা সেলিম মিয়া জানান, “কারে দোস দিমু আমি, কার উপরে এই গজব তুলুম আমি, আমার ছেলে যে কেন এই অঘটন ঘটাইছে এইটা আমি নিজেও বুজতে পারতাছিনা।
এছাড়াও আংটির জন্য নববধুর সাথে শাশুরির বিবাদের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি আরো বলেন, “বউয়ের বাড়ি থেকে আংটি দিছে না দেইখা আমি নিজে বাজার থাইকা আমার ছেলের জন্য একটা আংটি কিনে আনছি। কিন্তু এই ব্যাপারে আমার পরিবারে কোনো ঝামেলা আছিল না”। অন্যদিকে ছেলে হারিয়ে এখন বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন মা মর্জিনা বেগম। কোনো সান্তনাতেই থামছে না মায়ের ছেলে হারানো কান্না।
এবিষয়ে ঘটনার তদন্তকারি কর্মকর্তা ভৈরব থানার উপ-পরিদর্শখ দেলোয়ার হোসেন জানান, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছে আলআমিনের নিজ শয়নকক্ষে থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মৃতদেহ উদ্ধা করি। পরে লাশের ময়না তদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। তবে এঘটনায় এখনো পর্যন্ত কেউ লিখিত কোনো অভিযোগ দেয়নি। যদিও প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে তবু কোনো অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।