দুই সচিবের তুমুল বাকযুদ্ধ চলছে। টাকার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে এই বাকযুদ্ধে একজন দাবি করছেন ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। আরেকজন বলছেন ৫ লাখ নেয়া হয়েছে। তৃতীয় সচিব চুপ করে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে তাদের এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। তবে এই তিন জনই ভুয়া সচিব। তাদেরসহ এই নিয়োগ বাণিজ্য চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগ। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সামনে এইভাবে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হন তারা। তাদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ রহস্য উদঘাটন করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে ভুয়া নিয়োগ বাণিজ্যের।
জানা গেছে, গত বছরের ৬ এপ্রিল তৃতীয় শ্রেণির ৪৪টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চাকরির ফাঁদ পাতেন ভুয়া সচিব পরিচয় দেয়া অধ্যাপক আলমগীর হোসেন, রেজাউল হক টিটু ও হুমায়ুন কবির। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন পলাশ চন্দ্র সরকার, মো. আসাদুল হক, জাহিদ হাসান ও আসাদুজ্জামান ওরফে বাবু।
গ্রেপ্তার আলমগীরের বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্স বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে অধ্যাপনা শুরু করেন বৃহত্তর নোয়াখালীর বিভিন্ন কলেজে। একপর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন প্রতারণায়।
রোববার রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ও রাজবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে কয়েক শত আবেদনপত্র, প্রার্থীদের বিভিন্ন পরীক্ষার মূল সনদ, লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, শত শত নিয়োগপত্র, পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া নন জুডিশিয়াল স্টাম্প, ব্যাংক চেক, নগদ টাকা, মোবাইল ও ল্যাপটপ।
গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার চক্রটি বৃহত্তর যশোর-কুষ্টিয়া, রংপুর-রাজশাহী, চট্টগ্রাম-নোয়াখালী, ফরিদপুর-বরিশাল এলাকায় তাদের স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে স্নাতক পাস করা বেকার যুবক-যুবতীদের চাকরির বিজ্ঞাপন দেখিয়ে নিশ্চিতভাবে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতো। চক্রটি চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র গ্রহণ, লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভা কনডাক্ট করে বারকোড সম্বলিত হুবহু ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে নগদ অথবা চেকের মাধ্যমে ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা প্রার্থী ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিতো।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, চক্রটি প্রতারণার জন্য নিজেরাই অতিরিক্ত, যুগ্ম ও সহকারী সচিবের পদ সৃষ্টি করে। পরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চাকরির ফাঁদ পাততেন চক্রের নেতৃত্ব দেয়া ভুয়া সচিব আলমগীর, হুমায়ুন আর রেজাউল। তারা সারাদেশ থেকে দালালদের মাধ্যমে জোগাড় করেন তিন শতাধিক আবেদনপত্র। চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে পদ অনুযায়ী ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন প্রার্থীদের কাছ থেকে। গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর তাদের সহজ স্বীকারোক্তি একজনকেও তারা চাকরি দিতে পারেননি।
পুলিশ জানায়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যাতায়াত আছে চক্রটির। সেই সুবাদে চাকরি প্রত্যাশীদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য কখনও কখনও চক্রের সদস্যরা নিয়ে যেতেন সচিবালয়সহ অন্যান্য অফিসে। নিজেদের সচিব পরিচয় দিয়ে লোক দেখানো সাক্ষাৎকারেরও ব্যবস্থা করতেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য চক্রটি নোয়াখালী অঞ্চলের বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে প্রচার করতো। বলতো যে, বিশেষ কোটায় আলাদাভাবে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করে এই নিয়োগ দেয়া হবে। এজন্য তারা সেগুনবাগিচাসহ গণপূর্ত ভবন ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একক বা গ্রুপ ভিত্তিক পরীক্ষার্থীদের নিয়ে লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতো। পরে পাস সংগ্রহ করে সচিবালায়ে প্রবেশ করে কোন একটা রুমে নিয়ে গিয়ে নিজেরাই ইন্টারভিউ নিয়ে পরীক্ষার্থীর মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে ভেরী ওয়েল ডান বলে বিদায় দিতো।
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার রেজাউল ও হুমায়ুনসহ সকলেই প্রতারণার একাধিক মামলার আসামি। ইতোপূর্বে তারা সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়োগ সংক্রান্ত জালিয়াতি কান্ডে সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে জামিনে বেড়িয়েছেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার রেজাউল বলেন, প্রথমে হুমায়ুন সিভিগুলো সংগ্রহ করে আমার কাছে দেয়। পরে আলমগীর ভাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিয়ে যান। এরপর হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সিভিগুলো সাহাদাত হোসেন নামে একজনের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আলমগীর ভাই গৃহায়ন ও গণপূর্ত ভবনে পরীক্ষা নিতেন। পরীক্ষা নেয়ার পর আলমগীর ভাই ফোন দিলে উপরে উঠে প্রিন্ট করা কাগজটা নিয়ে আসা হতো। কিন্তু কখনোই আমরা কাউকে চাকরি দিতে পারিনি।
চক্রের আরেক সদস্য হুমায়ুন বলেন, চাকরি দেয়ার জন্য লোক নিয়ে আসতেন তিনি। আর সচিব আলমগীর সাহেব চাকরি দেন বলে জানি। কিন্তু আলমগীর সাহেব পরে কী করেন, সেটা আমি জানি না। শুধু বাহিরের লোক না, আমার নিজের আত্মীয়-স্বজনকেও চাকরির জন্য এনেছিলাম।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে তারা সিভি সংগ্রহ করতেন। সেইসঙ্গে ভুক্তভোগীদের আসল সার্টিফিকেট, মার্কশিট, ব্যাংক ড্রাফট, নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও নগদ টাকা নেন। কৌশলে প্রশ্নপত্র বানিয়ে বিভিন্ন সময় তাদের কাছ থেকে পরীক্ষা নিয়ে সবাইকেই পাস করিয়ে দেয়া হয়। এরপর ঢাকা শহরে বিভিন্ন অফিসে তাদের নিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট বসিয়ে সাধারণ ইন্টারভিউ নেয়া হয়।
উপপুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান আরও বলেন, বারকোড থাকা ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে হাতিয়ে নেয়া অর্থ দিয়ে তারা প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। রাজবাড়ী থেকে গ্রেপ্তার হওয়া একজন প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে ২ মাসের মধ্যে একটি দোতলা বাড়ি বানাচ্ছেন। সেইসঙ্গে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর বড় একটা শো রুম দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, তারা অনেক মানুষকে ঠকিয়েছেন।