মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন
নোটিশ :
আমাদের নিউজ সাইটে খবর প্রকাশের জন্য আপনার লিখা (তথ্য, ছবি ও ভিডিও) মেইল করুন onenewsdesk@gmail.com এই মেইলে।

ভৈরবে সরকার বাড়ি-কর্তা বাড়ির আধিপত্যের জের; ৫৬ বছরের ১৯ খুন

হৃদয় আজাদ, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৫
  • ১৩৯ বার পড়া হয়েছে
ভৈরবে সরকার বাড়ি-কর্তা বাড়ির আধিপত্যের জের; ৫৬ বছরের ১৯ খুন

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সাদেকপুর ইউনিয়নের মৌটুপি গ্রামে আধিপত্য বিস্তার কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের জের ৫৬বছরের। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান ক্ষমতার লড়াইয়ে এ-পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৯জন মানুষ। দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পঙ্গুত্বের মত অভিশাপ নেমে এসেছে সহস্রাধিক বয়স্ক নারী-পুরষসহ অবুঝ শিশু ও কিশোরদের জীবনে।

এসবের নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় দুই ইউপি চেয়ারম্যান। সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান তাদের দুই বংশের পেশিশক্তির জানান দিতে এসব নারকিয় সংঘর্ষ আর টেটা যুদ্ধ-কে আভিজত্য হিসেবেই দেখেন । যখন তখন তুচ্ছ ঘটনায় হামলা-মামলার ভয়ে বছরের বেশির ভাগ সময় বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয় এ-জনপদের মানুষদের। ফলশ্রুতিতে দিনদিন স্বাভাবিক গ্রামীণ জীবনযাত্রা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এ গ্রামের বাসিন্দারা। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাপক নীতিবাচক প্রভাব পড়েছে গ্রামের বিয়ে-শাদীসহ সব ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে। এমনকি গ্রামে কেউ মারা গেলে জানাজা নামাজেও ভাটা পড়ে স্থানীয় মুসুল্লীদের।

জানা যায়, এ গ্রামটি মূলত সমগ্র উপজেলাবাসীর কাছে দাঙ্গাবাজ হিসেবে পরিচিত । আতংকিত এই জনপদের ১৮টিরও বেশি বংশ নিয়ে এ গ্রামে আনুমানিক ১২হাজার মানুষের বসবাস। তবে গ্রামের মূল বংশ দুটি। একটি সরকার বাড়ি, অপরটি কর্তা বাড়ি। গ্রামের বাসিন্দাদের প্রত্যেকেই এ দুই বংশের কোনো না কোনো পক্ষের সমর্থক।

মূলত এ দুটি বংশের দ্বীমুখি নেতৃত্ব চলে এই জনপদে। বর্তমানে সরকার বাড়ির পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা সরকার শেফায়াত উল্লাহ। অপর দিকে কর্তা বাড়ির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রবীণ বিএনপি নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তোফাজ্জাল হক। উভয়পক্ষে সমর্থক হিসেবে রয়েছে ৭/৮শ পরিবার। মূলত এই দুই প্রতিদ্বধন্ধী নেতার আমল থেকেই বিরোধের নৃশংসতা ভয়াবহ রুপ ধারন করে। নিজেদের পেশিশক্তির জানান দিতে যেকোনো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে টেটা-বল্লম, রামদা-কিরিজ, তীর বা ধনুকসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে উভয়পক্ষ। সংঘর্ষ চলাকালে বিবেক-বোধ হারিয়ে একে অন্যের জীবন নিতে একটুও দ্বিধাবোধ করেন না তারা। বরং আধিপত্য ধরে রাখায় এসব সংঘর্ষকে আভিজাত্য মনে করেন উভয়পক্ষের লোকজন।

লোকমুখে প্রচলিত, দেশ স্বাধীনের পূর্ববর্তী সময়ে শুরু হওয়া এই দুই বংশের পেশি শক্তি প্রমানের লড়াই এখনো চলমান। কালের বিবর্তনে দুই পক্ষের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু সংঘাতের সমাধানে ফুটেনি কোনো আশার আলো। বরং অতীতের তুলনায় এ অঞ্চলে বর্তমানে আশংকাজনক হারে বেড়েছে তুচ্ছ ঘটনায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আর প্রাণহানীর মত ঘটনা।
এদিকে একপক্ষ আওয়ামীলীগ সমর্থিত বর্তমান চেয়ারম্যান সরকার শেফায়েত উল্লাহ এখনো দাপটের সহিত এলাকায় নিজের অবস্থান ধরে রেখে নিজসমর্থকদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অপরদিকে বিএনপি সমর্থিত সাবেক চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হক বর্তমানে নিজ এলাকা ছেড়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভৈরব শহরের একটি ভাড়া বাসায় অবস্থান করছেন। তবে তার সমর্থকরা তার নির্দেশনা উপেক্ষা করে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

দীর্ঘসময়ের এই সংঘাত থামাতে গত মাসে উপজেলার ১১টি গ্রামের বাসিন্দাদের মাঝে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব এমন ২১সদস্যের একটি শান্তি কমিটি গঠন করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। থেমে নেই প্রাণঘাতী টেটাযুদ্ধ। সবশেষ চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার দুই ইউপি চেয়ারম্যানের সমর্থকদের মাঝে ফের সংঘর্ষ বাধে। এতে উভয়পক্ষের ৯জন আহত হয়।

এছাড়াও সাবেক চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হকের নেতৃত্বে কর্তা বাড়ি ও বর্তমান চেয়ারম্যান শেফায়েত উল্লাহ’র নেতৃত্বে সরকার বাড়ি- এ দুইনেতা ও তাদের সমর্থকদের মৌন সমর্থন নিয়ে শুক্রবার (১৮এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে পার্শ¦বর্তী ইউনিয়ন শ্রীনগরের ভবানিপুর গ্রামে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষে ভবানিপুর গ্রামে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অন্তত ১০টি বংশের লোকজন ঘন্টাব্যাপি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে সুলাইমানপুর মহল্লার ময়দর মুন্সিবাড়ির রবিউল্লার ছেলে মিজান মিয়া (৪১) নামে একজন টেটাবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এঘটনায় উভয়পক্ষে আহত হন আরো অন্তত ৩০জন। সংঘর্ষ পরবর্তী বাড়ি-ঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঠেকাতে বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্থানীয় লোকজন জানান, ইতোমধ্যে আমাদের গ্রামটি দাঙ্গাবাজ গ্রাম হিসেবে বদনাম কুড়িয়েছে। এই গ্রামের নাম শুনলে বিয়ে-শাদি থেকে শুরু করে কোনো ধরনের আত্মীয়তা করতে রাজি হয়না কেউ বরং মুখ ঘুড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভম ফেরার পথ খুজেন যে কেউ। এমনকি এ গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতেই বিবাহ উপযুক্ত ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তাদের বাবা-মায়েরা।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক গ্রামে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত এমন কয়েকজন জানান, এ গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বই-পুস্তকের জ্ঞান অর্জনে আগ্রহ নেই। বরং টেটাযুদ্ধে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল শিখতেই বেশি আগ্রহী এ অঞ্চলের ছেলেরা। ফলশ্রুতিতে এ গ্রামের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গুলোতে দিন দিন আশংকাজনক হারে কমছে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষক সমাজ।

কর্তাবাড়ি সমর্থিত সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা তোফাজ্জল হক জানান, অনেক খুনের মামলার আসামী হয়েও শেফায়েত উল্লাহ বীরদর্পে এলাকায় অবস্থান করায় এবং আধিপত্য ধওে রাকায় এই বিশৃঙ্খলার একমাত্র কারণ। শেফায়েত উল্লাহগ গ্রেপ্তার হলেই এই সংঘাতের সমাধান হবে বলে মনে করেন তিনি।

অপরদিকে আওয়ামী সমর্থিত বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান শেফায়েত উল্লাহ জানান, তোফাজ্জল হক বর্তমানে বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আছে। যেকারণে সে নিজেকে অধিক শক্তিশালী প্রমাণ করতে এলাকায় সবসময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাখছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন জানান, বিবদমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরধারি অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গদের সমন্বিত ভূমিকা নেওয়ার আহবান জানান তিনি।

Tahmina Dental Care

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর

© All rights reserved © 2026 Onenews24bd.Com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com