যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নতিস্বীকার করাতে এবং নিজেদের পক্ষে বড় ছাড় আদায় করতে ইরান বর্তমানে বহুমুখী চাপ প্রয়োগের কৌশল জোরদার করছে।
পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্য পথ, নৌপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধের মূল্য বাড়াতে চাইছে ইরান। উপসাগরীয় কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা এমনটাই মনে করছেন।
চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জনের চেষ্টা না করে ইরান বরং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করছে। এর লক্ষ্য হলো সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধ এড়িয়ে সংঘাতের পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ানো।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাধ্য হয়ে তেহরানের দাবি মেনে নিতে পারে।
ইরানের কৌশল হলো—তাদের সঙ্গে সংকট দীর্ঘায়িত রেখে যে ক্ষতি ও ব্যয় বহন করতে হবে, তার তুলনায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য কম ক্ষতিকর হবে—এমন বার্তা দেওয়া।
তেহরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বড় ভূমিকা নিশ্চিত করে নতুন কোনো সমঝোতা বা পরিস্থিতি মেনে না নিলে সংঘাত পারস্য উপসাগরের সীমা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ইরান মনে করছে, একাধিক সামুদ্রিক চেকপয়েন্ট ও জ্বালানি সম্পদকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাইকেল নাইটস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “ইরান এমন সব কৌশল খাটায় যাতে প্রতি সপ্তাহে পরিস্থিতিকে নতুনভাবে উত্তপ্ত করে তোলার মতো কোনো না কোনো নতুন উপায় বা তাস তাদের হাতে থাকে। যেমন—একটি নতুন ভূখণ্ড, নতুন ধরনের অস্ত্র, নতুন ধরনের নিশানা।”
তিনি বলেন, “তাদের বড় সুবিধাটি এটি নয় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে আঘাত করতে পারে। তাদের বড় সুবিধা হলো, তারা আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
হরমুজের বাইরেও বাড়ছে চাপ
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো, সেই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার পাশাপাশি এখন লোহিত সাগর ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে ইরান।
লোহিত সাগর ও মিশরের বন্দর পর্যন্ত সংঘাতের প্রভাব বিস্তার করে বিশ্ব বাণিজ্যের ব্যয় বাড়াতে চাইছে তেহরান, যাতে ট্রাম্প প্রশাসন চাপের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডারদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়ায় নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াতে চাইবেন না।
অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে বলে মনে করছে ইরান।
উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা বলেন, “ইরানিরা বিশ্বাস করে যে যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করে এবং চাপ বাড়িয়ে তারা শেষ পর্যন্ত তাকে (ট্রাম্পকে) নতি স্বীকার করাতে বাধ্য করবে।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্প মনে করেন, তিনি ইরানিদের ওপর কঠোর আঘাত হানতে পারবেন এবং তাদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারবেন, কিন্তু তারা সহজে নতি স্বীকার করবে না।”
ট্রাম্পের দাবি বনাম ইরানের অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি ‘আসন্ন’ এবং সোমবার থেকেই সরাসরি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
তবে ইরান এ দাবি নাকচ করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
ট্রাম্প ইরানের ওপর কঠোর সামরিক হামলার হুমকি দিয়েও শেষ মুহূর্তে আঞ্চলিক মিত্রদের অনুরোধ এবং আলোচনার সুযোগ তৈরির জন্য তা স্থগিত করেন।
ইরানের মূল্যায়ন হলো, ট্রাম্পের বারবার হামলার হুমকি দিয়েও পিছিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে তেহরানের প্রতিরোধ কৌশল কার্যকর হচ্ছে এবং এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের চেয়ে তাদের অবস্থান শক্তিশালী।
সার্বিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার থেকে পিছিয়ে দিতে চাইছে, সেখানে ইরান পাল্টা সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ছাড় দিতে বাধ্য করার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে।