কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের অনাদিকালের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী নাজিরদিঘী নামের সরকারি খাস জলমহালটি জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে মোশাররফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি আত্মসাৎ প্রচেষ্টার প্রতিবাদে এলাকাবাসীর উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন অনুষ্ঠিত ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে ।
মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) দুপুর ১২ ঘটিকায় উপজেলার উছমানপুর ইউনিয়নের সরকারি জলমহাল নাজিরদীগির পারে এই বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এলাকার সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন উছমান পুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার ছাদিরুজ্জান বাছির, দীন ইসলাম, হাজী আঃ ছাত্তার, নূর মুহাম্মাদ, বুরহান মিয়া প্রমুখ। এ সময় বক্তারা জাল জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করে নাজিরদীঘিকে আত্মসাৎ চেষ্টাকারী বাজিতপুর উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামের মৃত বেলায়েত হোসেনের পুত্র মোশারফ হোসেনের বিচার দাবী করেছেন। পরে বাছির মেম্বারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল কুলিয়ারচর উপজেলার নির্বাহী অফিসার সাবিহা ফাতেমাতুজ-জোহরা নিকট নাজিরদীঘির ইতিহাস তুলে ধরে একই সঙ্গে মুশাররফ হোসেনকে ভূমিদস্যু উল্লেখ করে তাঁর বিচারের দাবীতে জেলা প্রশাসক বরাবরে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।
জানা যায়, এই নাজিরদীঘি জলমহালের নামে উপজেলার উছমানপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম ও একটি মোজার নামকরণ হয়েছে। প্রায় ২৫ একরের বিশাল সরকারি দিঘীটি চারিপাশে অন্ততপক্ষে ২০০ পরিবার বসবাস করে। প্রতি বছর এই দিঘি লিজ প্রদান করে সরকার রাজস্ব আদায় করে থাকে এবং লিজ গ্রহীতারা মৎস্য চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ মোশাররফ হোসেন জাল কাগজ ব্যবহার করে আদালতের রায় এবং ভূমি রেকর্ড নিজের পক্ষে নিয়ে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দিঘিটি নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি দাবি করে আত্মসাতের চেষ্টা করছেন।
ইতোমধ্যে তার জালিয়াতির অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরে জালিয়াতির বিরুদ্ধে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা গঠিত তদন্ত কমিটি জালিয়াতির প্রমাণও মিলে। তাছাড়া তার জালিয়াতিতে সহযোগিতা করার দায়ে একজন সহকারী তহসিলদারকে বরখাস্তের ঘটনাও ঘটেছে।
এলাকাবাসী জানা যায়, কুলিয়ারচর নাজিরদিঘী মৌজায় ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ১১১২ নম্বর এএস দাগে (১৫৩২ নাম্বার আরএস দাগ) ২৪ দশমিক ৮৪ একর আয়তনের ‘নাজিরদিঘী জলমহাল’ রয়েছে। যা ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন মৎস্যজীবীদের কাছে লিজ দিয়ে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে ।
এসব লিজ গ্রহীতার মধ্যে বাজিতপুর উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর পুত্র হামিদ উদ্দিন আহমেদ ইং ২০০৯ বাংলা ১৪১৫-১৪১৭ সনে এই দিঘির লিজ গ্রহীতা ছিলেন। সেই সময় সরকারি ভাবে লিজ গ্রহীতাকে দিঘীটি বুঝিয়ে দেন কুলিয়ারচর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি। সরকারি ভাবে লিজ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় যে ৫ জন সাক্ষী উপস্থিত ছিল তার মধ্যে ১নং সাক্ষী ছিলো ওই মোশারফ হোসেন। সে সময় মোশারফ হোসেন লিজ গ্রহীতা হামিদ উদ্দিনের সাথে যৌথভাবে এই দিঘিতে মাছ চাষও করেন।
এর কয়েক বছর পর বাংলা ১৪২০/১৪২২ সালে ৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় দিঘীটি লিজ নেন পূর্ব নাজিরদিঘী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অনুকূলে আব্দুস সাত্তার। সে সময় বিভিন্ন উপায়ে জাল কাগজ তৈরি করে দিঘীটি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে মোশারফ হোসেন ও তার মা হালিমা খাতুন মালিক সেজে দুই নং যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেন।
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ জেলা প্রশাসক বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত শেষে ততকালীন এডিসি (রাজস্ব) এর নিকট ৩ এপ্রিল ২০২৩ তদন্ত প্রতিবেদন জমাদেন। যে তদন্ত প্রতিবেদনে মোশারফের জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছেন উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর ইউমানপুর ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মনির উদ্দিন আহমাদ বলেন, মোশাররফ হোসেন দিঘী/জলমহালটি দাবি করছেন ৪ নম্বর খতিয়ানের মূলে। মূলত ১১১২ নাম্বার দাগ ১ নম্বর খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। সে জালিয়াতির মাধ্যমে ৪ নম্বর খতিয়ানে ১১১২ দাগ উল্লেখ করে মালিকানা দাবি করছে। যার কোনো ভিত্তি নেই। এছাড়া সরকারি সকল রেকর্ডে দিঘীটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবেই উল্লেখ আছে।
স্থানীয় উছমানপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার ছাদিরুজ্জামান বাছির বলেন বাজিতপুর মুনসেফি আদালতের ৫১/৬৮ নাম্বার মামলার রায় ও ডিগ্রি ব্যবহার করে তিনি এই ভূমি দাবি করছেন অথচ এই মামলার বাদী মজিবুর রহমান বিবাদী সাইদুর রহমান।