ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, অযৌক্তিক ‘ব্ল্যাকলিস্টিং’ বন্ধ এবং ছাঁটাইকৃত তৈরি পোশাক শ্রমিকদের পুনর্বাসনসহ নানা দাবিতে গাজীপুরের পাশাপাশি উত্তাল হয়ে উঠেছে সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলও।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের একপর্যায়ে উত্তেজিত শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এতে ছয় পুলিশসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচারে এবং কারখানাগুলোতে ভাঙচুর ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আশুলিয়ার কাঠগড়া, জিরাব, নরসিংহপুর এবং আমতলাসহ আশপাশের এলাকার ২৫টি তৈরি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ।
এ দিকে সংঘাতের মধ্যেই দুপুরের দিকে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত ‘নিউ এইজ’ কারখানার সামনে থেকে হাতবোমা সদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধার করা হয়।
শিল্প পুলিশ-১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ ফয়সাল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের মাঝে হাতবোমা সদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া সংঘর্ষের ঘটনায় শিল্প পুলিশের সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। কে বা কারা এই বস্তুগুলো সেখানে বহন করে এনেছে বা রেখে গেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আশুলিয়া থানাকে জানানো হয়েছে। পুলিশের টিম ঘটনাস্থলে এসে বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এদিকে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরেও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। এতে ওই যানচলাচল বন্ধ হয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রী ও চালকরা।
দুপুরে কালিয়াকৈর (চন্দ্রা) পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শুরু হওয়া এ অবরোধ বিকাল সাড়ে ৪টার দিকেও চলছিল বলে জানিয়েছেন কালিয়াকৈর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম।
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েকদিন ধরেই গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। মহাসড়ক অবরোধ, মিছিল, কারখানা ভাঙচুরসহ বিভিন্ন উপায়ে তারা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এর মধ্যে গাজীপুরের পাশে থাকা আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও আন্দোলনে সড়কে নামলেন শ্রমিকরা।
প্রত্যক্ষদর্শী, শ্রমিক ও শিল্প পুলিশ জানায়, সকাল থেকেই আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের কাঠগড়া বাজার, নয়াপাড়া, জিরাব ও নিশ্চিন্তপুর এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে কাজ বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন।
এ সময় কন্টিনেন্টাল, এআর জিন্স ও সিডব্লিউএসহ বেশ কিছু কারখানায় শ্রমিকরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। বিশেষ করে এআর জিন্স ও কন্টিনেন্টাল কারখানার বিভিন্ন গ্লাস ভাঙচুরের শিকার হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এআর জিন্সসহ সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
পরে দুপুর থেকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং মহাসড়ক ও শিল্পাঞ্চলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালান।
এতে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এই সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক ও পথচারী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আন্দোলনরত একজন শ্রমিক বলছিলেন, বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করা, শ্রমিকদের অন্যায়ভাবে তৈরি করা ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কালো তালিকা অবিলম্বে বাতিল করা, কাজের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কারণে-অকারণে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে।
শিল্প পুলিশ-১ এর পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, অসন্তোষের কারণে বেশ কিছু কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে শিল্পাঞ্চলজুড়ে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আহত হওয়ার খবর এসেছে, তবে প্রাথমিকভাবে বিস্তারিত তথ্য এখনো জানতে পারিনি।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনো কারণ ছাড়াই অনেক অভিজ্ঞ শ্রমিককে ছাঁটাই করে বিভিন্ন কারখানার মালিকপক্ষ যৌথভাবে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ তৈরি করছে, যার ফলে একবার কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হলে তিনি অন্য কোনো কারখানায় চাকরি পাচ্ছেন না। এমন বাস্তবতায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাজপথে নেমে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা খরচ, পরিবারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় একজন শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি (বর্তমানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা) পায়। তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই শ্রমিকরা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করে ৩০ হাজার টাকার দাবি করেন।
তিনি বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দাবি না মানায় শ্রমিকরা সকাল থেকে কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদেরও বের করে আনার জন্য ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পুলিশ শ্রমিকদের লক্ষ্য করে কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ে। অবস্থার অবনতি দেখে জিরাবো, নরসিংহপুর কাঠগড়া রোডের অধিকাংশ কারখানা একদিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ওইসব এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আতঙ্কে সড়কগুলো দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আন্দোলনের মুখে ২৫টি কারখানা ছুটি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।