হাওর- বাঁওেেড়র শিশুরা অ-আ-ক-খ শেখার পাশাপাশি প্রকৃতি থেকে পাঠ নেয় সাঁতারের। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তারা একদিন দেশ-বিদেশে সাঁতার প্রতিযোগিতায় স্পর্শ করে সাফল্যের স্বর্ণ শিখর। এ সহজ সত্যটির ওপর দাঁড়িয়ে দেশের একজন সফল সাঁতারু কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় একের পর এক তৈরি করে যাচ্ছেন কৃতী সাঁতারু। ওই কিশোর-তরুণেরা সাঁতার শিখছেন নিজের খ্যাতি দেশ ছািপয়ে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে ও ছড়িয়ে দিতে। তার রিলস প্রচেষ্টায় কারার মিজান ও কারার ছামেদুলের মতো সাঁতারুরা বহুস্বর্ণ জয় করেছেন সঙ্গে র্কমসংস্থানের বিষয়টাতো নিশ্চিত করেছেন। নিকলীর এই সাঁতারপ্রেমি মানুষটির নাম আবুল হাশিম।
হাশিম যখন কিশোর: নিকলী সদর ইউনিয়নের মীরহাটির আবুল কাশেমের ছেলে আবুল হাশিম তখন নিকলী হাইস্কুলের ছাত্র।শরীরচর্চা শিক্ষক আবদুর কাদির সাঁতার শেখান্ তখন পাকিস্তান আমল। প্রতিবছর পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলেক্ষে নিকলীতে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় সাঁতারও থাকে। বড় ক্লাসের ছাত্রদের সঙ্গে তাকে সাঁতার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিতেন ওই শিক্ষক। সহজাত প্রতিভার গুণে কিশোর হাশিম প্রায়ই বড়দের হারিয়ে প্রথম হন। এ সাফল্য কিশোর হাশিমকে ভীষণ আতœবিশ^াসী করে তোলে। কখনো বাড়ির পেছনে সোয়াইজনি নদীতে,কখনো পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে দক্ষ সাঁতারু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল আন্তঃস্কুল সাঁতার প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মৌসুমে জাতীয় এবং ঢাকা বিভাগীয় আঞ্চলিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় পাঁচটি স্বর্ণ পদকসহ ২০টি স্বর্ণ পদক লাভ করেন।
হাশিমের হাত ধরে: আবুল হাশিম মনে করেন, হাওর এলাকার মানুষ জন্মগতভাবেই সাঁতারে প্রতিভাবান। তবে প্রতিযোগিতায় সাফল্যপেতে হলে প্রতিভাই যথেষ্ট নয়,প্রয়োজন কঠোর অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ। এ ভাবনা থেকে ১৯৮৫ সালের দিকে নিকলীর উপজেলা সদরের একটি পুকুরে এলাকার ছেলেদের সাঁতার শেখানো শুরু করেন , সঙ্গে চলে কঠোর প্রশিক্ষণ। নিকলীর মধ্যে আবুল হাশেমই সাঁতার কেটে প্রথম সাফল্য পান। শুরুর দিকে তাকে দেখেই স্থানীয় অনেকেই সাঁতারে আসতে থাকলেন। সাঁতার প্রশিক্ষক আবুল হাশিম তার হাতে গড়া সাঁতারুদের বলতে গিয়ে জানান, নিকলীর কারার বাড়ির কারার মিজানুর রহমানকে তিনিই দিনের পর দিন প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশসেরা সাঁতারু বানিয়েছেন।
১৯৯৩ কারার মিজানুর রহমানের সাফ গেমসে স্বর্ণপদক জিতে দেশের বির্বর্ণ সাঁতারে আশার এক ক্ষীণ আলো জালিয়েছিলেন। ১৯৮৫ সাল থেকে কারার মিজানুর রহমানের বয়সভিত্তিক সাঁতারেও বহুবার স্বর্ণ জিতেছেন। কারার মিজানুর রহমানের চাচাতো ভাই কারার ছামেদুল ইসলামও সাঁতারে তার কাছ থেকেই প্রশিক্ষণ নেন। ২০০১ সাল পাকিস্তানে আয়োজিত সাফ গেমসে সুইমিংয়ে নামলেন নিকলীর তরুণ সাঁতারু কারার ছামেদুল সব মিলে জিতিলেন চারটি স্বর্ণপদক। তার আগে ১৯৯৯ সালে নেপালে আয়োজিত সাফ গেমসে জিতেছেন রৌপ্য পদক। ২০০২ সালে বাংলাদেশ গেমসে ১০০ মিটার সাঁতারে মিজানের গড়া (১.০৯মিনিট) রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেন ছামেদুল। তিনি সময় নিয়ে ছিলেন (১,০৭ মিনিট)। দেশের কিশোর-তরুণদের সামনে সেই উদাহরণ তৈরি করে দিয়েছেন নিকলীর ছেলেরাই এই উপজেলারই আরও অন্তত ৭০ জন তরুণ এই সাঁতারেই আলো ছড়িয়েছেন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে।
যার সুবাদেই চাকরি মিলছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী , বিমানবাহিনী ও পুলিশবাহিনীতে। এদের মধ্যে অেেনক নারী ও আছেন। সাঁতারে নিকলীর তরুণদের খ্যাতির এই গল্প এখানেই শেষ নয়। নিকলীর স্থানীয় দুটি সাঁতার প্িরশক্ষণ ক্লাব রয়েছে। প্রশিক্ষক ও কয়কেজন কৃতী সাঁতারুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সাঁতারে কৃতিত্ব দেখিয়ে নিকলী থেকে সেনাবাহিনীতে চাকরি হয়েছে ৭০ জনের , নৌবাহিনীতে পনরজনের, বিমানবাহিনীতে দশজনের, পুলিশে ৮ জনের আর কারা পুলিশে ৬জনের চাকরি হয়েছে। সাঁতারে কৃতিত্বের সূত্র ধরে একটি উপজেলা থেকে এতজনের চাকরি পাওয়ার কৃতিত্ব বিরল। এরা সবাই বয়সভিত্তিক কিংবা জাতীয় পর্যায়রে প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। নিকলীর অনেক মা-বাবা এখন তাঁদরে সন্তানদের তুলে দিচ্ছেন স্থানীয় সাঁতার প্রশিক্ষকদের হাতে। সাঁতারুর খনি নিকলী থেকে সর্বশেষে উঠে আসা বিস্ময় তরুণরে নাম আরফিুল ইসলাম।পূর্বসুরি সাঁতারুদের দেখে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে আরিফুল। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে (বিকেএসপি) একাদশ শ্রেণির ছাত্র। ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বয়সভত্তিকি সাঁতারে ১৩টি ইভেন্টের সব কটিতেই স্বর্ণপদক জিতেছে । এর মধ্যে ২০১৫ সালে তিনটিতে করেেছ জাতীয় রের্কড। আরিফুলের চোখ এখন সাফ গেমসে। বর্তমানে ২০২১ সালে জাপানে সাফ গেমসে অংশ নেওয়ার জন্য নৌবাহিনীতে চুক্তি ভিত্তিক সাতাঁরু হিসেবে ফ্্রান্সে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে আরিফুল। আরিফুলের বড় ভাই শরিফুল ইসলাম ২০১৩ সালে জাতীয় র্পযায়ে সাঁতারে পাঁচটি স্বর্ণপদক পেয়েছেন।
২০১৪ সালে জাতীয় পর্যায়ে পেয়েছেন পাঁচটি স্বর্ণ পদক। কৃতী সাঁতারু কারার ছামেদুল বলেন, সাঁতারের জন্যই নিকলীর অনেকেই জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে খ্যাতি পাচ্ছেন। পাচ্ছেন বিভিন্ন বাহিনীতে চাকরি । তা দেেেখ এলাকার অনেক তরুণ-কিশোরেরা সাঁতারে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
যোগ্য পিতার যোগ্য দুই ছেলে আবুল হাশিমের ছেলে নিয়ামুল হক ও নাজমুল হক । বর্তমানে সেনা সদস্য নিয়ামুল জুনিয়র জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০২ পর্যন্ত ৩৫টি সোনা জিতেছেন। আরেক ছেলে সেনা সদস্য নাজমুল হক ২০০৯ সালে ভারতের মুির্শদাবাদ ১৯ কিলোমিটার সাঁতারে দ্ধিতীয় স্থান পান।, ২০০৫ সালে জাতীয় সাঁতারে চারটি স্বর্ণ, ২০০৬ সালে তিনটি স্বর্ণ, ২০০৭ সালে চারটি স্বর্ণপদক পান। আবুল হাশেম বলেন, এই সাঁতার আমাদের খ্যাতি দিয়েছে। দেশবাসীর কাছে নিকলীর পরিচয় তুলে ধরেছে। বর্তমানে আবুল হাসেম বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশনের সদস্য।
রয়েছে দুটি প্র্িরশক্ষণ ক্লাব: কারার মিজান সাফ গেমসে স্বর্ণপদক জেতার পর ১৯৯৪ সালে আবুল হাশেম নিকলী সুইমিং ক্লাব গড়ে তুললেন। ভাটি বাংলা নামে আরেকটি সুইমিং ক্লাব ২০১১ সালে গড়ে ওঠে। দুটি ক্লাবই বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের অনুমোদন পেয়েছেন। নিকলী সুইমিং ক্লাবের সদস্য ও প্রশিক্ষণার্থী দেড়শতাধিক আর ভাটি বাংলার সদস্য ও প্িরশক্ষণার্থীর সংখ্যা ২০০ শতাধিক।
নারীরাও পিছিেিয় নেইা: সাঁতার কৃিতত্ব থেকে পিছিয়ে নেই নিকলীর নারীরাও। নিকলীর মেেেয় রুমানা আক্তার, প্রিয়াঙ্কা আক্তার ও নাসরিন বেগম সাঁতারে কৃতিত্ব দেখিয়ে সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা আক্তার ২০১৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে একটি রৌপ্যপদক পান। আর রোমানা আক্তার একই সালে জাতীয় র্পযায়ে পেয়েছেন ১১টি স্বর্ণপদক। ভাটি বাংলা ক্লাবে ২০০ জন সদস্য ও প্িরশক্ষণার্থীর মধ্যে ২০ জন নারী। আর নিকলী সুইমিং ক্লাবে সদস্য ও প্রশিক্ষণার্থী ১৫০ জনের মধ্যে ১০ জন নারী। সবার একটাই দাবী নিকলীতে একটি ভালো মানের সুইমিংপুল নির্মাণ।
এত পানির দরকার নেই ঃ সাঁতারপ্রেমি হাশিম বলেন, চারদিকে কত পানি। কিন্ত এত পানির প্রয়োজন আমার নেই। কেবল ৫০ মিটার একটা সুইমিং পুল দরকার। সুইমিং পুল পাওয়া গেলে নিকলী থেকে প্রতিবছর বহু জাতীয় পর্যায়ের সাঁতারু বের হবে। নিকলী বলে কোনো কথা নেই, সুইমিং পুল থাকলে আর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে দেশের সব জায়গা থেকে সাঁতারু তৈরি হবে।
সরজেমেিন একদিন ভাটি বাংলা সুইমিং ক্লাবের প্রশিক্ষণ দেখতে গিয়ে জানা গেল, তাদের প্রশিক্ষণ চলে নিকলী উপজেলা পরিষদের ভেতরে একটি পুকুরে। স্থানীয় অন্য একটি পুকুরে চলে নিকলী সুইমিং ক্লাবের প্রশিক্ষণ। কথা হলো সাঁতার প্রশিক্ষক, সংগঠক ও প্রশিক্ষণার্থী সাঁতারুদের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, নিকলীতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাতো দুরের কথা, ডাইভ দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই। প্রশিক্ষণার্থীরা সুইমিং পোশাক, কিকবোর্ড, হ্যান্ড প্যাডেল, ওয়াটার গ্লাাস, ওয়াটার ক্যাপ ছাড়াই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। অনেকে আেেছ গামছা পরে। আর বর্ষাকালে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় প্রকৃতির সুইমিং পুল হাওরের পানিতে। সাঁতারে নিকলীর ছেলেদের কৃিতত্ব সর্ম্পকে সম্প্রতি আরিফুল ইসলাম বলেন, নিকলীর সাঁতারুদের মনোবল শক্ত। তিনি একটি তথ্য তুলে ধরেন , বিকেএসপির সাঁতার বিভিাগে র্বতমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮০ জন। এর মধ্যে নিকলীরই ৩৮ জন।
ভাটিবাংলা ক্লাবের স্থানীয় সাঁতার প্িরশক্ষক আবদুল জলিলের ভাষায়, সাঁতার জানলেই ভালো সাঁতারু হওয়া যায় না। নিয়ম মেনে অনুশীলন করতে হয়।, সাঁতারে প্রচুর শক্তি ক্ষয় হয়। শারীরিক সামর্থ্যের জন্য উন্নত খাবার গ্রহণ করতে হয়। কিন্ত আমাদের সাঁতারুদের অনেকে আসেন না খেয়ে।
নিকলী সুইমিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম ও ভাটি বাংলা সুইমিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কারার দিদারুল মনির তোফায়লে শোনালনে সাঁতারে নিকলীর ছেলেদের গৌরবের গল্প। পরে জানালেন, নৌবাহিনীর পারভজে আহমদে জাতীয় র্পযায়ে জুনয়ির মিড সাঁতারে ২০০৫ সালে পাঁচটি স্বর্ণপদক, সেনাবাহিনীর রফিকুল ইসলাম ২০০৮ সালে জাতীয় পর্যায়ে দুটি স্বর্ণ, সেনাবাহিনীর আনোয়ার হোসনে ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে সাঁতারে তিনটি স্বর্ণপদক পান বিকেএসপির ছাত্র নাজমুল হক, ফারুক আহম্মেদ ২০১৮ সালে জাতীয় পর্যায়ে একটি স্বর্ণ পদক,জাতীয় পর্যায়ে মোঃ ইসলাম তিনটি স্বর্ণপদক, মোঃ হাকিম মিয়া একটি স্বর্ণপদক,আমিরুল ইসলাম জয় তিনটি স্বর্ণপদক , প্রমি আক্তার তিনটি স্বর্ণপদক ওর ছোটবোন শর্মি আক্তার দুইটি স্বর্ণপদক পেয়েছেন।
কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের কথা ঃ নিকলী ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও সদর ইউনিয়নের চেয়ারম ্যান কারার শাহরিয়া আহম্মেদ তুলিপ বলেন, নিকলী ক্রীড়া সংস্থা থেকে সাঁতারের জন্য কিছু সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। তবে একটি সুইমিং পুলের অভাবে সাঁতারুরা ভালো ভাবে প্রশিক্ষণ নিতে পারছে না।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি সামছুদ্দিন মুন্না বলেন, নিকলী ক্রীড়া সংস্থা থেকে সাঁতারের জন্য কিছু সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল্ল। নিকলীতে একটি সুইমিং পুলের জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নিকট একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি। একটি উপজেলা থেকে এতো সাঁতারু ন্যাশনাল পর্যায়ে অংশ গ্রহণ করা বিরল ঘটনা। বিষয়টি আমাকে বিস্ময় করেছে। আমি ও আমার প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবধরণের সহযোগিতা করবো।