দিল্লির আখড়া ! তার মানে দিল্লি যেতে হবে? না, দিল্লির আখড়া দেখতে দিল্লি যেতে হবে না। কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা মিঠামইনে গেলেই দেখা যাবে হিন্দুদের তীর্থস্থান এই দিল্লির আখড়া।
যাকে ঘিরে রয়েছে অনেক জনশ্রুতি কথিক আছে, নারায়ণ গোস্বামী নামে এক জন এখানে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন নিকটবর্তী বিথঙ্গল আখড়ার প্রধান গোস্বামী রামকৃষ্ণ বৈষ্ণবের শিষ্য।তার অলৌকিক কার্য সম্পাদনের কাহিনী মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে পৌছে।সম্রাট তার এক দূত প্রেরণ করেন নারায়ণ গোস্বামীকে দিল্লিতে নিযে যাওয়ার জন্য। মোগল দূত একটি সোনার মোহর নিয়ে তার দর্শনাথী হন। কিন্ত নারায়ন গোস্বামী মোহরটি নদীতে নিক্ষেপ করেন। মোগল দূত এতে অপমানবোধ করেন এবং গোস্বামীকে ভর্ৎসনা করেন। পরে নারায়ন গোস্বামীর নির্দেশে নদীতে অনেক সোনার মোহর ভেসে ওঠে এবং দূতকে বলেন তার মোহর সে চিনে নিতে। দূত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গোস্বামীর কাছে প্রার্থনা করেন।
পরবর্তী সময়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে গোস্বামীকে ২২৬ একর জমি দান করেন এবং গোস্বামীর জন্য একটি উপসনালয় (আখড়া) গড়ে দেন। কালক্রমে এটি দিল্লির আখড়া নামে পরিচিত হয়ে উঠে। এটাই কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলীয় মিঠামইন উপজেলার ঐতিহাসিক দিল্লির আখড়া। আখড়ার মূল ভবনে নারায়ণ গোস্বামীর সমাধি অবস্থিত। কথিত আছে, সমাধিটি স্বর্ণ দ্বারা মোড়ানো ছিল। কালক্রমে সেই সোনা চুরি হয়ে যায়। আগের সেই জাঁকজমক না থাকলেও আজও দূর-দূরান্ত থেকে অনেক নারী-পুরুষ অসুখ-বিসুখের ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজের জন্য আখড়ার মোহন্তের কাছে আসেন। বিপদমুক্তি বা পুন্য সঞ্চয়ের আশায় আখড়ার মাটিতে ভক্তি করে হাত রাখে হাওর এলাকার সহজ-সরল ভক্তপ্রাণ মানুষ। মিঠামইন উপজেলায় আরো রয়েছে মালিকের দরগা, ভাটিয়ার আখড়া ও গোদরের আখড়া। এগুলোর প্রত্যেকটির রয়েছে গৌরবময় ঐতিহ্য, যা হতে পারে গবেষকদের জন্য অনুসন্ধিৎসার বিষয় এবং পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান।
অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব রয়েছে দিল্লির আখড়ার। আখড়ার প্রধানকে বলা হয় মোহন্ত। তিনি থাকেন চিরকুমার। আখড়ার প্রতিষ্ঠা-পুরুষ নারায়ণ গোস্বামীও ছিলেন চিরকুমার। সেই থেকে আখড়ার মোহন্তসহ সকল সন্ন্যাসী চিরকুমার অবস্থায় জীবনযাপন করেন। আখড়ার মোহন্তরা এখানে আসেন সাধারণ মানত হিসেবে। কোনো ছেলে-সন্তান যখন খুব কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়, তখন তার পিতা-মাতা তাকে আখড়ায় দেওয়ার মানত করে। আখড়ার বর্তমান মোহন্তের নাম নারায়ন দাস গোস্বামী। তার বাড়ি ছিল মিঠামইন উপজেলার আটপাশা গ্রামে। পাঁচ বছর বয়স থেকে তিনি এ আখড়ায় আছেন। তার বর্তমান বয়স (৭৫) বছর। আখড়ার সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ গোস্বামীর নাম দীপরাম বৈষ্ণব (৯৩) এবং সর্বকনিষ্ঠের নাম অনন্ত গোস্বামী (৪৫)। দীপরামের বাড়ি মিঠামইনের কালীপুর গ্রামে। আখড়ায় আসার পর একবারও তিনি বাড়িতে যাননি, বাড়ি যাওয়ার নিয়ম নেই।
অবশ্য এখন শত ইচ্ছা করলেও তিনি আর বাড়িতে ফিরতে পারবেন না । কারণ ১৯৯৩ সালের বন্যায় কালীপুর গ্রামটি চিরদিনের জন্য হাওরের পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। অনন্তের বাড়ি চন্ডিপুর গ্রামে। গ্রামটি আখড়ার কাছাকাছি হলেও অনন্ত আর কখনোই নিজের বাড়িতে তার পরিবার-পরিজনের কাছে যেতে পারবেন না। জীবন তাকে এ আখড়ায় কাটাতে হবে।এটাই নিয়ম ।