করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পুরো পৃথিবী যখন ধুঁকছে, প্রকৃতি তখন মেলে ধরেছে নিজের রূপ। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার হাওর ঘুরে এসে সে রূপের কিছুটা তুলে ধরার লোভ সামলানো কঠিন হলো। হাওরে ফুটেছে সূর্যমুখী। এ যেন নীল আকাশের নিচে হলুদের খেলা। সকাল সকাল এ খেলা দেখতেই হাওরের দিকে ছুটছে শত শত মানুষ। উপজেলা পরিষদের সামনের সড়ক থেকে নেমে আঁকাবাঁকা পথ। পথের ধারে চোখে পড়ল, গরু-মহিষের পাল নিয়ে রাখাল যাচ্ছে হাওরের বিস্তীর্ণ জমির ঘাস খাওয়াতে। এবড়ো-খেবড়ো পথ একসময় শেষ হয়ে যায়। সমতলে কেবল সবুজ ঘাস।
হঠাৎ চোখ আটকে যায় দূরে থাকা সূর্যমুখীর বাগানে। হাওরের ওপর এই ফুলের বাগান যেন বাড়তি সৌন্দর্য। ছুটতে থাকি বাগানের দিকে। ফিঙে পাখি বসেছে সূর্যমুখীর ওপর। কোমল রোদের আলোতে ফুলগুলো যেন হাসছে। স্থানীয় কয়েকজন তরুণ এসে মুঠোফোন দিয়ে ছবিও তুলছে। কেউ-কেউ ক্যামেরায় ক্লিক করছে। ফুলবাগানে মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি এসে আবদার করলেন, ‘স্যার ফুলের ছবি নেন, কিন্তু আমার জমিটা নষ্ট করবেন না।
হাওরের জমিতে সাধারণত বোরো ধানের চাষই বেশি হয়। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে প্রায় প্রতিবছর ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে হাওরপারের কৃষকেরা বিকল্প শস্য চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এবার সরকারিভাবে প্রদর্শনী করতে কয়েক জন কৃষককে সূর্যমুখীর চাষ করার পরামর্শ দেন কৃষি অফিস। কেউ কেউ সূর্যমুখীর চাষ শুরুও করেছেন। নিকলী সদর ইউনিয়নের চামারটুলা গ্রামের বাসিন্দা মোঃ জালাল উদ্দীন এবং মোঃ নবী হোসেন এর যৌথ তৈরিতে গড়ে তুলে এ সূর্যমুখী ক্ষেত ।
আলাপচারিতায় নিকলী সদর ইউনিয়নের চামারটুলা গ্রামের কৃষক মোঃ জালাল উদ্দিন ও নবী হোসেন বললেন, প্রতিবছরই তাঁরা বোরো ধানের আবাদ করেন। কিন্তু, প্রকৃতি রুষ্ট হলে প্রায়ই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয় না। বানের জলে ভেসে যায় স্বপ্ন। তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের এ ব্যাপারে উৎসাহ জুগিয়েছেন। দিচ্ছেন নিয়মিত পরামর্শ। বীজ রোপণ থেকে শুরু করে ফুল ফোটা ও পুনরায় বীজ সংগ্রহে মোট ১১০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে। তবে বীজ সংগ্রহের পর কী করবেন সেটা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন। কারণ, বীজ থেকে তেল তৈরির কোনো যন্ত্র তাঁদের নেই।
এখন তাদের সেই সূর্যমুখী বাগান ভাইরাল ক্ষেত নামেই পরিচিত পেয়েছে জেলায়। এই ভাইরাল ক্ষেত দেখতে দূর দূরান্ত থেকে নিকলী বেড়িবাধঁ হাওরে ছুটে আসছে পর্যটকরা। ঢাকা, কুমিল্লা, রাজশাহী, গাজিপুর, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলার পর্যটকরা শুধুমাত্র সূর্যমুখী জমিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলার জন্য পাড়ি জমাচ্ছেন নিকলীতে।
এব্যাপার ক্ষেতের মালিক মোঃ জালাল উদ্দীনের সাথে কথা বললে তিনি জানান, কিছু দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জমিটি ভাইরাল হবার পড় দূর দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসতেছে এবং অনেক পর্যটক শুধু ছবি’ই তুলছেন না অনেক ফুলও নষ্ট করে দিচ্ছেন। ক্ষেতের মালিক মানা করার পরও মানছে না তার কোন কথা। গাজিপুর থেকে ভাইরাল ক্ষেত দেখতে আসা একজন দর্শনার্থী বলেন যদি ক্ষেতের চার দিক বাঁশের বেড়া থাতো তাহলে সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পেত।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানায়, এবার রবি মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষককে পরামর্শ দেওয়া হয় সূর্যমুখীর চাষ করতে এবং সরকারিভাবে প্রদর্শনী করা হবে। কিন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জমিটি ভাইরাল হবার পড় প্রদর্শনীর বদলে মালিকের ক্ষতি হয়ে গেল।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, সরকারিভাবে সূর্যমুখীর তেল তৈরির একটি যন্ত্র কেনার ব্যাপারে তাঁরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে সরিষা বীজ ভাঙানোর যন্ত্রেও সূর্যমুখীর বীজ ভাঙিয়ে তেল সংগ্রহ সম্ভব। কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সূর্যমুখীর তৈলে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নেই। এছাড়া ঝাঁঝযুক্ত ক্ষতিকর লিনোলিক অ্যাসিডও থাকে না বরং এ তৈলে স্বাস্থ্যকর ‘ইরোসিক অ্যাসিড’ থাকে। এক কেজি সূর্যমুখীর বীজে ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম তৈল পাওয়া যায়। আর এক কেজি সরিষায় মেলে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম তেল। ফলে সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের বেশ আগ্রহ রয়েছে।