হাওরজুড়ে এখন সবুজ ধানের বিপুল সমারোহ। ধানের আলোয় ভাসছে কিশোরগঞ্জের নিকলীর পুরো হাওর। সবুজ ধানের শিষ লালচে হতে শুরু করেছে। ধান পাকছে, আশা জাগছে কৃষকের মনে। ফলনও ভালো হয়েছে। কৃষকের চোখে-মুখে বইছে আনন্দের ঝিলিক।
নিকলীর হাওর এলাকায় গত বছর এ সময় ছিল করোনায়া কৃষকদের হাহাকার। তখন দিশেহারা হয়ে পড়েন তাঁরা। কিন্তু এবার করোনা থাকলেও হাওরের পরিস্থিতি ভালো। গত বছরে নিঃস্ব কৃষক এবার কষ্টে ফলানো ধান গোলায় তোলার স্বপ্ন দেখছেন। ধান কাটার প্রস্ততি নিচ্ছেন তাঁরা। বৈশাখ আসছে, আর তো মাত্র কটা দিন। বৈশাখ এলেই হাওরে হাওরে শুরু হবে ধান কাটার উৎসব।
কৃষক কাবিল সর্দার (৭০) এখন প্রতিদিন এক চক্কর হাওরে যান। ধানের কী অবস্থা, আর কয় দিন লাগবে পাকতে, সেটা নিজের চোখে দেখে আসেন। বড় কষ্টে এবার জমিতে ধান লাগিয়েছেন তিনি। বুকজুড়ে আশা, এবার ধান তুলতে পারবেন।
কাবিল সর্দারের বাড়ি উপজেলার সিংপুর গ্রামে। গ্রামের পাশের বড় হাওরে দুই একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। গত বছরও একইভাবে ধান লাগিয়েছিলেন। কিন্তু সব ধান তলিয়ে যায়,এবারও জমি আবাদ করতে গিয়ে ঋণ করতে হয়েছে। তবে ভালোয় ভালোয় ধান তুলতে পারলে সব ধারদেনা শোধ করা যাবে। কাবিল সর্দার বলেন, করোনার কারণে একটা বছর খুব কষ্টে কাটাইছি।
বড় হাওরের ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে কাবিলের গ্রাম। গ্রামের পাশেই ধানমাড়াই ও শুকানোর জন্য কিছু জায়গা পরিষ্কার করছিলেন তার স্ত্রী। স্থানীয়ভাবে ধানমাড়াই ও শুকানোর এই স্থানকে ‘খলা’ বলে। সঙ্গে তাঁর স্কুলপড়ুয়া মেয়েও যোগ দিয়েছে কাজে। সিংপুর গ্রামের বড় কৃষক সুনামউদ্দিন মাষ্টার (৭০)। প্রতিবছর পাঁচ থেকে ছয় শ মণ ধান পান। গত বৃহস্পতিবার (১ এপ্রিল) সকালে এই প্রতিবেদককে হাওর দেখান তিনি। হাওরে এখন পানি নেই, হাওরজুড়ে ফসলের সমারোহ। সুনামদ্দিন মাষ্টার বলেন, ‘ফসল গেলে কী যে কষ্ট এইটা বইলা বোঝাইতাম পারতাম না। এখন হাওরের দিকে ছাইয়া ছাইয়া দুই হাত তুইলা দোয়া করি, ইবার যেন ধানের কোনো ক্ষতি না অয়।’
এই আকাংঙ্কা শুধু সুনামদ্দিন মাষ্টারের নয়, পুরো হাওরবাসীর। নিকলী-বাজিতপুরের স্থানীয় সাংসদ সদস্য (এম,পি) আফজাল হোসেন বলেন, হাওরের ফসল রক্ষায় এবার সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কাজও হয়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। আমরা সবাই মিলে পরিশ্রম করেছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের পরিশ্রমের ফল দেবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ বেলায়েত হোসেন বলেন, এ বছর ৩৬ হাজার ৮৬৩ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। এখন বিচ্ছিন্নভাবে কিছু হাওরে ধান কাটা হচ্ছে। পুরোদমে ধান কাটা শুরু হতে আরও এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামছুদ্দিন মুন্না বললেন,আমরা হাওরের ফসল রক্ষায় প্রয়োজনীয় বাঁধের কাজ করেছি। নিকলীর হাওরে ধান পাকতে শুরু করেছে। প্রাকৃতিক দূযোগ না হলে কৃষক এবার হাসিমুখেই তাঁদের ধান গোলায় তুলতে পারবেন। আমরা কৃষকদের সেই হাসির ঝিলিক দেখতে চাই।