নদ-নদী, খাল-বিল পরিবেষ্টিত কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা। শুকনোকালে তো বটেই বর্ষাকালে ও এই ভাটি অঞ্চলে বিশেষ করে হাওর এলাকায় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যমই ছিল নৌকা। আগের দিনে পালতোলা নৌকায় করে যাতায়াত হতো। মালামাল পরিবহনে এবং নববধূদের নাইয়রে যেতেও ব্যবহৃত হতো পালের নৌকা। এখন আর সেই যুগ নেই। যান্ত্রিক সাভ্যতার এই যুগে সেই পালের নৌকা হারিয়ে গেছে। পালের নাও যেন এখন কেবলি স্মৃতি।
বর্তমানে যোগাযোগে ব্যবহৃত নৌকার শতকরা ৯০ ভাগই হচ্ছে ইঞ্জিনচালিত। পালের নৌকা নয়, এখন যাত্রী কিংবা মালামাল পরিবহনের জন্য ঘাটে বেঁধে অপেক্ষায় থাকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নদীতে ভট ভট শব্দ করে পানিতে প্রচ- ঢেউ তুলে চলাচল করে সেসব নৌকা। ইঞ্জিনচালিত নৌকার বিকট আওয়াজে নদী কিংবা হাওরের দুই পাড়ের গ্রামবাসীরাও অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। কান তাদের ঝালাপালা করে।
অথচ মাত্র দুই-তিন দশক আগেও এই ইঞ্জিনচালিত নৌকাই ছিল না এ অঞ্চলে। শরৎ কিংবা বর্ষা, হেমন্ত কিংবা বসন্ত সব ঋতুতেই নদ-নদীতে দেখা যেত রঙ-বেরঙের পালতোলা নাও। বাতাসের গতির টানে নৌকা চালানোর জন্য ব্যবহৃত হত ছোট-বড় নানা আকৃতি ও নানা বর্ণের পাল। নদীতে কিংবা খালে এই পালতোলা শত শত নৌকা সবার দৃষ্টি কাড়ত। নায়ের মাঝি পাল তুলে দিয়ে বসে থাকত। আর নৌকা চলত তার আপন গতিতে, ছলাৎ ছলাৎ শব্দে। বিভিন্ন আকৃতি ও নানা বর্ণ-বৈচিত্র্যে ভরা সেসব পাল। নৌকাগুলো বাতাসের অনুকূলে ধেয়ে চলত যাত্রী নিয়ে কিংবা মালামাল নিয়ে। মাঝিরা আরামে বসে বসে গাইতো জারি-সারি কিংবা ভাটিয়ালী গান। সেসব ছিল এক নয়নাভিরম দৃশ্য। এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে নিয়ে যেত যাত্রী অথবা মালামাল।
আর বাতাসপ্রবাহ কমে গেলে মাঝিরা গুণ টানত। অবশ্য গুণটানার কাজটি ছিল বেশ কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন কাজকেও তারা সাবলীলভাবে করে যেত। গুণ টেনে নিয়ে যেত নৌকা এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে, এর ওপরই নির্ভর করে চলত তাদের জীবন ও জীবিকা।
নিকরী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কারার শাহরিয়া আহমেদ তুলিপ বলেন, সেই দিন এখন আর নেই। সময়ের ব্যবধানে পালের নৌকার প্রচলন হারিয়ে গেছে। নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওরে পালতোলা নৌকা এখন চোখেই পড়ে না।বর্তমান প্রজন্মদের জন্য এখন রঙ-বেরঙের পালের নৌকা এখন কেবলি স্মৃতি।