দিলীপ কুমার সাহা :
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন চারটি ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় এগার বছরেও শেষ হয়নি। ঠিকাদার নতুন ভবনের ৫০ শতাংশ কাজও শেষ করেনি। বাকি কাজ কবে হবে কেউ জানে না।
নতুন ভবন হাতে না পাওয়ায় হাসপাতালের ৫০ শয্যার কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। আবাসন সমস্যার কারণে চিকিৎসকরা থাকছেন না হাসপাতাল চৌহদ্দিতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আছেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা। আর হাসপাতালের রোগীরা পোহাচ্ছেন চরম দুর্ভোগ।
গত ২৬ মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য আফজাল হোসেনের নিকট এলাকাবাসী দীর্ঘ দিনে নিকলীর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নির্মাণ না হওয়ায় বিষয়ে অভিযোগ করেন , স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের যথাযথ তদারকি না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা সাংসদকে অবগতি করেন।
এ সময় সাংসদ আফজাল হোসেন বলেন , আমি তিনবার ডিউ লেটার দিয়েছি এবং ঢাকা গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে কথা বলে ওই ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে যতদ্রুত সম্ভব নতুন টেন্ডার দেওয়ার চেষ্টা করছি।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ কিশোরগঞ্জ নির্মাণ রক্ষাণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা ইউনিটের (এইচ ই ডি) সহকারী-প্রকৌশলি মো: সালাউদ্দিন চৌধুরী জানান , ঠিকাদার প্রভাবশালী হওয়ায় দীর্ঘ দিন ধরে সে দেশের বাইরে রয়েছে। কাজ দ্রুত শেষ করতে প্রতিষ্ঠানটিকে গত কয়েক বছর ধরে চিঠি চালাচালি করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এতে কাজ না হওয়ায় ওই ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে কিছু দিনের মধ্যে নতুন করে টেন্ডার আহবান করে বাকি কাজ শেষ করা হবে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করতে পুরনো ভবন সংস্কারসহ নতুন চারটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দোতলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন, চিকিৎসকদের দোতলা আবাসিক ভবন , দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের আবাসিক ভবন ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের তিনতলা আবাসিক ভবন নির্মাণ ও পুরোনো হাসপাতাল ভবন সংস্কারের কাজটি পায় ঢাকার মেসার্স-কাজল বিল্ডার্স নামে প্রতিষ্ঠান। পাঁচ কোটি ১৪ লাখ টাকার এই কাজ ২০০৮ সালের ১৬জুন নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০০৯ সালের ৩১ডিসেম্ভরের মধ্যে ভবনগুলো কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাঝে মধ্যে শ্রমিক পাঠিয়ে একটা বিল করার মত কাজ করে উধাও হয়ে যায়। এভাবেই চলছে দশ বছর। সর্বশেষ আড়াই বছর আগে কিছু শ্রমিক পাঠানো হয়েছিল। তারা কিছু কাজ করে চলে গেছেন। যে কাজ করছে তার মানও খুব খারাপ।
গত বৃহস্পতিবার (১৬ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় নির্মাণাধীন ভবনগুলো নষ্ট হচ্ছে। এগার বছর আগে ভবনের যে কাছ হয়েছে সে গুলোরও টেম্পার নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ওই ভবনে নতুন করে কাজ করলে যে কোনো মুহুর্তে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) আস আদ দীন মাহমুদ উপজেলার আইন শৃঙ্খলা সভায় জানান, বর্তমানে এগুলোতে দিনরাত বসছে মাদকাসক্তদের জমজমাট আড্ডা। রাতে চলে জুয়ার আসর ও অসামাজিক কার্যকলাপ আর এর জন্য অপরাধীরা ভবনগুলো বেছে নিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পুরোনো ভবনের সংস্কার নতুন ভবনের সঙ্গে যুক্ত। তাই আমরা পুরনোটা আদালাভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারছি না। হাসপাতালের দরজা-জানালা সব ভেঙে যাচ্ছে। পয়ঃপ্রণালী ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে রোগীদের শরীরে পানি পড়ে। অবস্থা এমন যে, পারতপক্ষে রোগীরা এ হাসপাতালে ভর্তি হতে চায় না। এটি আমাদের জন্য খুবই দূভাগ্যজনক।
কিশোরগঞ্জের সিভির সার্জন মোঃ হাবীবুর রহমান বলেন , নিকলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে জেলার অন্য যেসব হাসপাতালের কাজ শুরু হয়েছিল সেগুলোর নির্মাণকাজ নয় বছর আগেই সম্পন্ন হয়েছে। একমাত্র ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে নিকলীর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হলো না। আমি প্রতি মাসে জেলা উন্নয়ন সভায় এ সমস্যা নিয়ে কথা বলি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
হাসপাতালে গিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোন লোক বা প্রতিনিধিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাজল বিল্ডার্সের কোন দায়িত্বশীল লোকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, এ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পালিয়েছে। তারা আর ফিরে আসবে মনে হয় না।