কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষককে ২১ মাসের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ না করেই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষকরা বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ ও চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
জানা যায়, হোসেনপুর পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ২০১৮ সালে জাতীয়করণ করা হয়। পরবর্তীতে অবসরজনিত কারণে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকের পদ শূন্য হলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই শিক্ষকদের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কলেজ শাখায় দুজন, দিবা শাখায় পাঁচজন এবং প্রভাতী শাখায় পাঁচজনসহ মোট ১২ জন দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ছিলেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, নিয়োগের পর প্রথমদিকে তারা নিয়মিত বেতন পেলেও পরবর্তীতে বেতন প্রদানে অনিয়ম শুরু হয়। দুই থেকে তিন মাস পরপর এক মাসের বেতন পরিশোধ করা হতো বলে দাবি তাদের। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে বেতন অনিয়মিত থাকায় ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তাদের ২১ মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত ১৭ ও ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. খায়রুল ইসলাম একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে ১২ জন খণ্ডকালীন শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতির নোটিশ দেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জানান, দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় তাদের অনেকেই সংসারের দৈনন্দিন খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কেউ কেউ ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। পাওনা বেতন পরিশোধ ছাড়াই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ বলে জানান। বিষয়টির সম্মানজনক সমাধান না হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা।
সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহকালে চাকরিচ্যুত শিক্ষক মো. ওবায়দুর রহমানসহ কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে কোনো শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের ভাষ্য, এ সিদ্ধান্তের দায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। তারা বকেয়া বেতন পরিশোধসহ চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
তবে হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, তিনি চলতি বছরের ৪ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। খণ্ডকালীন শিক্ষকদের যে বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে, তার বেশির ভাগই তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের সময়ের।
তিনি জানান, তার দায়িত্বকালীন বেতন-ভাতা আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে পরিশোধের চেষ্টা করা হবে। তিনি আরও বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অর্থ ও নিরীক্ষা শাখার পরিচালক মশিউর রহমান তাকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের ফান্ড থেকে আগের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হলে ভবিষ্যতে ওই অর্থ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছ থেকে আদায় করা হতে পারে।
এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুন নাহার মাকছুদা বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। তবে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের নিয়োগের সময়, চাকরির মেয়াদ এবং কবে তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তার জানা নেই।
তিনি বলেন, ‘স্কুল ফান্ডে যদি টাকা থেকে থাকে, চাকরিচ্যুত করা হলেও সর্বোচ্চ যতটুকু দেওয়া যায়, ততটুকু দেওয়া উচিত।’
বকেয়া বেতনের দায়ভার নিয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘আগের সময় কি তারা কাজ করেননি? ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কি তাদের কাজ করতে দেখেননি? বকেয়া থাকতেই পারে। যিনি অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকবেন, তাঁরই দায়িত্ব বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের দাবি, দীর্ঘ ২১ মাসের বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধ এবং তাদের চাকরির বিষয়ে ন্যায্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।