হাওর-বাঁওড়ের জেলা কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা। এক সময় এ জেলাকে দেশীয় পাখির রাজ্য বলা হতো। কিন্তু গ্রামগঞ্জের বাসাবাড়ি আধুনিকায়নের ফলে কমেছে দেশীয় পাখির আশ্রয়ের ঠিকানা। আবার কীটনাশকযুক্ত ফসল খেয়েও মারা যাচ্ছে পাখি। ফলে নিকলীর হাওরে কমছে দেশীয় পাখি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের মানুষ প্রয়োজনের তাগিদেই ঝাউ-জঙ্গল কাটছে। সবার ঘরবাড়ি টিনের ঘর থেকে দালান হচ্ছে। ফলে পাখিরা বাসস্থান হারিয়ে ছুটছে অন্যত্র। ফলে পাখির কিচিরমিচির ডাকে এখন আর ঘুম ভাঙে না স্থানীয়দের।
গ্রামের প্রবীণরা বলেন, আগেও মাঠ-ঘাট, ক্ষেত-খামারে বিচিত্র পাখির বিচরণ ছিল। পাখিরা সে সময় ঝাঁকে ঝাঁকে খাদ্য অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকতো। তখন ফসলের মাঠে পাখি বসার দৃশ্য সচরাচর দেখা গেলেও এখন তা পাওয়া যায় না। অতীতে গ্রাম এলাকায় ব্যাপকহারে টুনটুনি, চিল, পানকৌড়ি, ডাহুক, বালি হাঁস, কোকিল, বক, শালিক, ঘুঘু, দোয়েল, বাবুই, কাকসহ বিভিন্ন পাখির দেখা মিলতো। বর্তমানে জাতীয় পাখি দোয়েল, কাঠ ঠোকরা, কোকিল, ডাহুক, বাবুই, ঘুঘু, বাওয়াই, শালিক, টুনটুনি, মাছরাঙা, টেইটেরা, গোমড়া ও প্যাঁচাসহ অনেক পাখি আর তেমন দেখা যায় না। শোনা যায় না এসব পাখির ডাক। গ্রামবাংলার অতি পরিচিত বসন্তের যে পাখি ‘বউ কথা কও’ বলে গ্রামের প্রতিটি মানুষকে মাতিয়ে রাখতো সেই পাখির দেখা আর পাওয়াই যায় না। ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই চেনে না এসব পাখি। ফলে শিশু-কিশোরদের কাছে দিন দিন হয়ে যাচ্ছে এসব পাখি ইতিহাস।
বিজ্ঞরা জানান, গ্রামগঞ্জে ফসলে কীটনাশক ব্যবহার পাখি বিলুপ্তির ক্ষেত্রে অনেকাংশেই দায়ী। কৃষকরা বিভিন্ন ফসলে সব সময় কীটনাশক ব্যবহার করেন। এতে পাখির খাদ্য ফড়িং, ফুতি, প্রজাপতি, মশা, লেদা পোকা, গোয়ালীসহ বিভিন্ন প্রকার কীটপতঙ্গ মারা যায় বা রোগে আক্রান্ত হয়। পাখি দিনের পর দিন এসব খেয়ে মারা যাচ্ছে। এছাড়া শিকারিদের নিষ্ঠুরতা তো রয়েছেই। ফলে পাখির বিলুপ্তির কারণে যেমন জীববৈচিত্রের সংকট বাড়ছে, তেমনি হারিয়ে ফেলছে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ।
সদর উপজেলার তৈইলাহাটি গ্রামের বাসিন্দা ৬৮ বছরের বিল্লাল হোসেন বলেন, আমার বয়স যখন ১০ তখন গ্রামে কত রঙের পাখি ছিল তা বলে শেষ করতে পারব না। ঘরের চালে পাখি বাসা বাঁধতো। পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙত। অথচ এখন আর সেই পাখি নেই।
বানিয়া হাটি গ্রামের বাসিন্দা শুক্কুর মাহমুদ বলেন, আগে মাঠে ফসল ফলানোর সময় চারদিকে পাখি বসে থাকতো। কিন্তু এখন মাঠ আছে, ফসল আছে, গ্রাম আছে অথচ সেই পাখি নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গৃহবধু বলেন, আগে যখন পুকুর থেকে পানি আনতাম তখন পুকুরের চারপাশে কত পাখি থাকতো, পাখিরা কিচিরমিচির করত। অথচ এখন পাখিই তেমন দেখা যায় না।
উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আসিফ ইমতিয়াজ মনির বলেন, গ্রামের চারদিকে ঘনবসতির কারণে পাখি এখন আশ্রয়স্থল হারাচ্ছে। শুধু তাই নয়, কীটনাশকযুক্ত ফসল খেয়ে অনেক পাখি মারা যাচ্ছে। পাখি রক্ষার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই হয়তো আবারও পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাবে।
নিকলী উপজেলা পাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার রফিকুল ইসলাম বলেন,নিকলীর হাওরে পানকৌড়ি, ভূতিহাঁস, পিয়ংহাঁস, খয়রাবগা, লেঞ্জাহাঁস, নেউপিপি, সরালি, রাজসরালি, চখাচখি, পাতি মাছরাঙা, পাকড়া মাছরাঙা, মরিচা ভূতিহাঁস, সাধারণ ভূতিহাঁস, শোভেলার, পাতিহাঁস, ডাহুক, বেগুনি কালেম, গাঙচিল, বালিহাঁস, ডুবুরি, বক, সারসসহ দেশি-বিদেশি পাখি রয়েছে। এর মধ্যে ৯৮ প্রজাতির পরিযায়ী, ১২১ প্রজাতির দেশি ও ২২ প্রজাতির হাঁসজাত পাখি আছে। কিন্ত বর্তমানে এ সব পাখির বেশি ভাগই বিলুপ্ত প্রায়। তিনি আরো বলেন, অতিথি পাখি প্রতি বছর ডিসেম্বরের শুরুতে আসতো। হাওরে জলকেলি আর দল বেঁধে গাছের ডালে সঙ্গিনী নিয়ে উড়াউড়ি করতো। অথচ কয়েক বছর ধরে হাওরে পাখিই আসে না। তিনি বলেন, যদি পাখি শিকারিরা কোনো উৎপাত না করতো তাহলে হয়তো কিশোরগঞ্জের নিকলীর হাওরে নিরাপদ আশ্রয় ভেবে বেশি বেশি পাখি আসত।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) প্রীতিলতা বর্মন বলেন, নিকলীর হাওরে অতিথি পাখি যাতে কেউ শিকার না করতে পারে সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্টদের নীবিড়ভাবে হাওর তদারকি করতে নির্দেশ দেয়া আছে। যে পাখি শিকার করবে তাকেই আইনের আওতায় এনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।