স্বপ্ন ছিল প্রবাসের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে ঋণের বোঝা নামাবেন। কেউ চেয়েছিলেন নতুন করে সংসার সাজাতে, কেউ সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে, আবার কেউ পাকা ঘরের অসমাপ্ত কাজ শেষ করে স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের কাছে ফিরবেন। সেই স্বপ্নগুলো এগিয়ে যাচ্ছিল বাস্তবতার পথে। কিন্তু ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই কেড়ে নিল সবকিছু।
সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ প্রবাসী নিহত হয়েছেন। যাদের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছিল পরিবার, সেই প্রিয় মানুষগুলোর এখন দেশে ফেরার অপেক্ষা। তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দী হয়ে।
রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়।
এ ঘটনায় একসঙ্গে ১৩টি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। গন্ডগোহালী, উজানপৈ, ডুবাইসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। যে পরিবারগুলোতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে স্বস্তি ফিরেছিল, সেই বাড়িগুলোতেই এখন কান্না আর আহাজারি।
নিহতদের মধ্যে একই গ্রামের চারজন। তারা হলেন—আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২), তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)।
এ ছাড়া সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮) নিহত হয়েছেন।
গন্ডগোহালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মোহন ও সুমনের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দুই সন্তানকে হারিয়ে বারবার বিলাপ করছেন মা ময়না খাতুন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ময়না খাতুন বলেন, তাঁর বড় ছেলে সাত বছর আগে এবং মেজো ছেলে দুই বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কোনোদিনই ছুটিতে বাড়িতে আসতে পারেননি। সন্তানরা ঋণ পরিশোধ করে বাড়ির কাজ শেষ করে দেশে ফেরার স্বপ্নের কথা বলতেন।
তিনি বলেন, ছেলেরা বলতেন, ‘মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি। বাড়ির কাজ শুরু করছি। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করে বিয়ে করব।’
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দুই ছেলের অপেক্ষায় থাকা মায়ের ঘরে এখন ফিরবে তাঁদের নিথর দেহ।
একই গ্রামের নিহত রুবেল প্রামাণিকের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। মাত্র ১৪ দিন আগে নাতনির মুখ দেখেছিলেন তাঁর বাবা মোহাম্মদ সাইদুর। তখন কে জানত, সেই আনন্দের পরই নেমে আসবে এমন নির্মম শোক।
মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, রুবেল প্রায় নয় বছর আগে সৌদি আরবে যান। সাড়ে ছয় বছর পর ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। দেশে ফিরে বিয়ে করেন। পরে আবার সৌদি আরবে চলে যান। সেখানে সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন।
তিনি বলেন, ‘আমার নাতনি হয়েছে মাত্র ১৪ দিন। সেই নবজাতক মেয়েটাকে রেখে আমার ছেলে চলে গেল। আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকল না।’
নবজাতক শিশুর মুখ দেখার আনন্দ শেষ হওয়ার আগেই বাবাকে হারানোর বেদনা নেমে এসেছে পরিবারটিতে।
ডুবাই গ্রামের নিহত হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁর দাবি, কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ফলে আগুন লাগার পর শ্রমিকেরা বের হতে না পেরে প্রাণ হারান।
তিনি বলেন, কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমাতেন এবং রাতে কাজ করতেন। আগুন লাগার সময় তাঁরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন।
হাসিবুল ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করার পর স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। পরে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরাতে ও জীবিকার তাগিদে প্রায় তিন বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান।
স্বজনদের অভিযোগ, পরিবারের জন্য ভালো ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে যাওয়া এই তরুণদেরই শেষ পর্যন্ত ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে।
নওগাঁর গন্ডগোহালী, উজানপৈ, ডুবাইসহ বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে এখন প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা। তবে সেই অপেক্ষায় নেই কোনো আনন্দ, নেই বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। অপেক্ষা শুধু কফিনবন্দী আপনজনের।
স্বজনদের কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, আবার কেউ প্রিয় মানুষের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তাঁদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ। শোকের ভারে অনেক বাড়িতেই যেন থমকে গেছে সময়।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার বিষয়ে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দেশে ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।