কটিয়াদীতে এনজিও কর্মী পরিচয়ে ঋণ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কয়েকটি গ্রামের মানুষের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়ার পর একটি কথিত এনজিও চক্র উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, কয়েক দিনের মধ্যে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে গা-ঢাকা দিয়েছে চক্রটির সদস্যরা।
উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের ভাট্রা, মিরেরপাড়া, মাগুরাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনার পর টাকা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। কষ্টে জমানো সঞ্চয় হারিয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছেন। এ ঘটনায় শনিবার করগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাট্রা গ্রামের শহীদ মিয়ার স্ত্রী নার্গিস আক্তার কটিয়াদী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে একজনের নাম উল্লেখ করে কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ৪-৫ জনের একটি দল কয়েক দিন আগে করগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে নিজেদের এনজিও কর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা নিজেদের ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’-এর লোক দাবি করে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে স্থানীয়দের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে। পরে এনজিও থেকে ঋণ, টাকা, গরু ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে সঞ্চয়ের নামে টাকা সংগ্রহ করে।
এ সময় প্রতি এক লাখ টাকা সঞ্চয়ের বিপরীতে বছরে ১০ হাজার টাকা লাভ দেওয়ার কথাও বলা হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানান। তাদের কথায় বিশ্বাস করে গ্রামের বিভিন্ন নারী ১০ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার, ৩০ হাজার, ৪০ হাজার এমনকি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের বলা হয়, মানিকখালী বাজারে তাদের অফিস রয়েছে। একপর্যায়ে কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য সবাইকে সেখানে যেতে বলা হয়। গত সোমবার ২০ থেকে ৩০ জন নারী সেখানে গিয়ে কথিত অফিসে কাউকে পাননি। পরে তাদের দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। এরপরই টাকা নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে না পেরে সন্দেহ তৈরি হয় ভুক্তভোগীদের মধ্যে।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে দক্ষিণ ভাট্রা গ্রামের নার্গিস আক্তারের কাছ থেকে ৫০ হাজার, একই এলাকার সুকেল মিয়ার স্ত্রী সেলিনার কাছ থেকে ৩০ হাজার, মাগুরা গ্রামের রোজিনার কাছ থেকে ৪০ হাজার এবং আরও একজনের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া আরও অনেকের কাছ থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি মানিকখালী এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্য বাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল দলটি। গত সোমবার কাগজপত্র ও অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষরের কথা থাকলেও তারা সেখানে উপস্থিত হয়নি। পরে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে বাড়ির মালিকের পরিবারের সদস্যরা জানান।
এ ছাড়া মানিকখালী বাজারের ডেকোরেশন ব্যবসায়ী জামাল মিয়ার কাছ থেকেও মালামাল নেওয়ার পর বিল পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে দলটির কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়ে।
ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তার বলেন, তিল তিল করে কষ্টে জমানো টাকা নিয়ে ওরা উধাও হয়ে গেছে। ফোন করলে নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এখন আমরা চিন্তায় আছি। টাকা ফেরত চাই।
আরেক ভুক্তভোগী সেলিনা বলেন, ডিম-মুরগি বিক্রি করে জমানো টাকা তাদের দিয়েছি। এনজিওর লোক পরিচয় দেওয়ায় বিশ্বাস করেছিলাম। আসল-নকল আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝব? আমরা টাকা ফেরত এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
মানিকখালী বাজারসংলগ্ন বাসার মালিকের ছেলে মফিজুর রহমান সারুফ বলেন, জয়িতা ফাউন্ডেশনের এনজিও কর্মী পরিচয় দিয়ে তারা আমার মায়ের কাছে অফিস ভাড়া নিতে এসেছিল। পরে কাগজপত্র দিয়ে সোমবার চুক্তি করার কথা ছিল। কিন্তু তারা আর আসেনি। ওই দিন কয়েকজন নারী-পুরুষও তাদের খোঁজে সেখানে আসেন। পরে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয়।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কথিত এনজিও কর্মী আতিক হাসান ওরফে আতিকুর ও জহিরুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
করগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাদিম মোল্লা বলেন, ঘটনার পর একজন ভুক্তভোগী আমাকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। পাশাপাশি এলাকায় যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য মানুষকে সচেতন করা হবে।
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে প্রলোভনের মাধ্যমে এনজিও পরিচয় ব্যবহার করে একটি চক্র অপকর্ম করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন ও সজাগ থাকা জরুরি। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।