দিলীপ কুমার সাহা :
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণে ১০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম গুরুই ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রাম। বিদ্যালয় নেই, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই, নেই কোনো উন্নত যোগাযোগের ব্যবস্থা। সাত বছর আগেও গুরুই ইউনিয়নের ওই গ্রামের অনেক পরিবারেরই আর্থিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। এখন দিন বদলেছে। সেই সঙ্গে ঘুচছে দৌলতপুরের ছয় শতাধিক পরিবারের দৈন্যদশা।
যার হাত ধরে এই পরিবর্তনের সূচনা , তিনি নুরজাহান আক্তার (৪০)। শাড়িতে নকশা তোলার হাতের ‘কারচুপির’ কাজ শিখে নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন তেমনি গ্রামের অনেক পরিবারের অসহায় ও দরিদ্র নারীদের এই কাজ শিখিয়ে তাদের আর্থিক উপার্জনের পথ দেখিয়েছেন নুরজাহান। রঙিন শাড়িতে কাজ করে এখন তারা রঙিন স্বপ্ন দেখার সাহস করেন। ঈদের সময় ওই হাতের কাজ করা শাড়ির সিজন (জোয়ার সময়)। তাই কাজের চাপ থাকে বেশি , কারিগরদের দম ফেলার সময় যেন নেই ।
এখন দৌলতপুর গ্রামে গেলে দেখা যাবে বেশির ভাগ পরিবারের নারী ও ছোট ছেলে-মেয়েরা বাড়ির উঠানে বসে জর্জেট কাপড়ে জরি, চুমকি ও পুঁতি দিয়ে নিপুন হাতে কাজ করে একটি সাধারণ শাড়িকে কীভাবে অসাধারণ করে তুলছেন।
যেভাবে বদলে দিলেন নুরজহান শুরুর কথা : পচিশ বছর আগে দৌলতপুর গ্রামের হবি মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় জেলার বাজিতপুর উপজেলার কুকরাই গ্রামের নুরজাহান আক্তারের। বিয়ের পর স্বামী কর্মহীন ছিলেন। বিয়ের পরে স্বামী এলাকায় বিভিন্ন মানুষের জমিতে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। কিন্ত অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। পরিবারের অবস্থা ফেরানোর স্বপ্ন ছিল নুরজাহানের। আত্মবিশ্বাসী ওই নারী সাত বছর আগে স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি বাজিতপুর যাওয়ার পথে চরারচর ইউনিয়নের নয়াহাটি গ্রামে দেখেন সেখানকার নারীরা জর্জেট শাড়িতে কারচুপির কাজ করছেন। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে নারীদের কাজ দেখে তার ভালো লাগে। কাজটি শিখতে সে অধীর আগ্রহী হন।
কয়েক দিন পরই বার কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে বাবার বাড়ি থেকে এসে তাদের সঙ্গে শাড়িতে কারচুপির কাজ শিখতে শুরু করেন। ২৫ দিন তাদের সঙ্গে থেকে কাজ শিখে দৌলতপুর স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসেন। কাজ শিখে আসার সময় বাড়িতে কাজ করার জন্য তাদের কাছ থেকে ৫ টি জর্জেট কাপড় নিয়ে আসে । বাড়িতে এসে এক জোড়া কানের দুল ১৫০০ টাকায় বিক্রি করে ৮০০ টাকা দিয়ে একটি কাঠের ফ্রেম কেনেন। এরপর পুরোদমে শুরু করেন এই হাতের কাজ।
নুরজাহানের হাতের কাজ দেখতে অনেকে এসে দাড়িঁেয় থেকে দেখেন। পরে নুরজাহানের কাছ থেকে গ্রামের অন্য অনেক পরিবারের বৌ-ঝিরা কাজ শেখেন।এখন ওই গ্রামের প্রায় ছয় শতাধিক নারী এ কাজ করে তারাও উপার্জন করছেন।
দৌলতপুর গ্রামে একদিন : সম্প্রতি দৌলতপুর গ্রামে নুরজাহানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি ও তাঁর প্রতিবেশী রহিমা বেগম (৩৫), দিপালী রাণী দাস (২৮), সাবিনা রাণী দাস (২৬), মণি আক্তার (২৪), রোজিনা আক্তার (৩৭), লায়লা বেগম (৩৪) ও কাকলী রাণী দাস (২৯) রং- বেরংঙের জর্জেট শাড়িতে নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলছেন নানা ধরণের নকশা। একটি সাধারণ জর্জেট শাড়ি কারচুপির কাজের পর কতটা অসাধারণ হয়ে উঠে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
দৌলতপুর গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতেই দেখা গেছে নারীরা শাড়িতে সুঁই দিয়ে চুমকি , জরি , পুঁতি বসানোর কাজে ব্যস্ত। কয়েকজন শাড়িতে কাজ করা কারিগরের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, উজ্জ্বল রঙের ওপরে নকশাগুলো ফোটে ভালো। এতসব নকশা আপনারা কোথায় পান জানতে চাইলে কয়েকজন নারী কারিগর বলেন , তাদের নিজস্ব জ্ঞানে তৈরি কয়েকটি ‘ক্যাটালগ’ এবং যারা আমাদের জর্জেট কাপড় দিয়ে যায় তারা নকশা ও বিভিন্ন মডেলের পরা শাড়ির নকশা এনে দিয়ে যান।
কয়েক জন শিল্পী ঈদ ও দূর্গা পুজার কয়েকটি নকশা এনে দেখান। তারা জানান ,নকশা যত জটিল হবে আমাদের পারিশ্রমিক তত বেশি হবে।
মাসে পাচঁ হাজার আয় : একটি জর্জেট কিংবা টিস্যু শাড়িকে কারচুপির কাজে সাজাতে একজন কারিগরকে ছয়-সাত দিন সময় লাগে। যেসব পাইকার অর্ডার দিয়ে যান , তারাই শাড়িতে কাজ করতে প্রয়োজনীয় সুঁই, সুতা, চুমকি, জরি ও পাথর দেন। প্রতিটি শাড়ির মজুরি বাবদ নারী কারিগরদের দেওয়া হয় ৮০০ থেকে ১৫০০ হাজার টাকা। একজন নারী কারিগর মাসে চার-পাঁচটি শাড়িতে কাজ করতে পারেন। গড়ে মাসে তাদের চার থেকে পাঁচহাজার টাকা আয় হয়। ঢাকা মিরপুরের কাপড় ব্যবসায়ী মো: বিল্লাল মিয়া জানান , সপ্তাহে দু’বার দৌলতপুর গ্রামের নারীদের পুঁজি, জরি, চুমকি, পাথর ও জর্জেট কাপড় দিয়ে যান। প্রতি মাসে ওই গ্রামে ১০০০ হাজার থেকে ১২০০ শাড়ি তৈরি হয়। এগুলো পরে ঢাকার বিভিন্ন বিপণিতে বিক্রি করা হয়।
সফলদের কথা : অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র সুমন মিয়া ,তার বোন একই ক্লাসের ছাত্রী জোসনা , ছোট ভাই কামাল ষষ্ট শ্রেণীতে পড়ে। তার বাবা জসিম উদ্দিন পেশায় কৃষক। সারা বছর সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকত। নিজের স্ত্রী, ছেলে-মেয়েরা কারচুপির কাজ করে এখন সংসারে সচ্ছলতা এনেছে। জসিম উদ্দিন জানালেন, ছেলে- মেয়েদের সহযোগিতায় তার পরিবার এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো । একটি টিনের ঘর, একটি গাভী ও একটি টেলিভিশন কিনেছি। মো. জাল্লাল উদ্দিন সারা বছর মানুষের বাড়িতে দিন মজুরি করেও সংসারের অভাব দুর করতে পারেননি। মেয়ে জান্নাতুল আক্তার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় শাড়িতে কারচুপির কাজ শুরু করে। বর্তমানে সে দশম শ্রেণীর ছাত্রী । জান্নাতুল আক্তার বলে , পড়ালেখার খরচ চালিয়েও সংসারে প্রতি মাসে দেড়-দুই হাজার টাকা দিতে পারি। এখন সংসারের অভাব খেটেছে। একই অবস্থা ছিল কৃষক সামু মিয়ার সংসারেও।কৃষিকাজ দশ সদস্যের সংসার চালাতে দারিদ্রের সঙ্গে তার কঠিন লড়াই করতে হতো।এখন আর সেই অবস্থা নেই। ছেলে মল্লিক ও মেয়ে কুলসুম শাড়িতে কারচুপির কাজ করে নিজেদের পড়ার খরচ চালিয়েও প্রতি মাসে আড়াই-তিন হাজার টাকা দেয়। মনি আক্তার (২৪) বলেন, ছয় বছর আগে স্বামী তাকে তালাক দিয়ে অন্য আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করেন। এর পর আমি চোখে অন্ধকার দেখি । পরে নুরজাহান আপার কাছে এসে কারচুপির কাজ শিখি। আল্লার রহমতে এখন আমার আর কোনো অভাব নেই। এখন আর কারোর উপর নির্বর করতে হবেনা। দৌলতপুর গ্রামের নারীদের প্রভাব পড়েচে পাশের দাসপাড়া , নয়াহাটি ,মাইজহাটি ,সাতুডা ,গুরুই শিবির পাড়া , পালপাড়া , বেতিরচর , পারাবাজিতপুর ,গুরুই পূর্বপাড়া , ছাতিচর , ইলচিয়া ও নিকলী সদর ইউনিয়নেও। এখন এসব গ্রামের প্রায় আট শতাধিক নারী শাড়িতে কারচুপির কাজ করছেন। ছাতিরচর গ্রামের বেগম আক্তার (৪২) বলেন , আমরা দাবি করি নারী-পুরুষের সম- অধিকার দিতে হবে। কিন্ত সম- অধিকার পাইতে সংসারের কাজও সমানভাবে করতে হবে। তাই জর্জেট শাড়িতে কারচুপির কাজ করে স্বামীকে সংসারের জন্য আর্থিকভাবে কিছুটা হলেও সহযোগিতা করতে পারছি । এতে আমার মনে কিছুটা হলেও শান্তি লাগছে।
নুরজাহান আক্তারের কথা : নুরজাহান আক্তার বলেন , আমি শাড়ির কাজ শিখার পর সংসারে বাড়তি আয় শুরু হলো। এখন আর অভাব নেই। আমার দুই মেয়ে হিমা আক্তার ও আসমা আক্তার পড়ের দশম শ্রেণীতে। আর এক ছেলে সুমন ষষ্ট শ্রেণীতে পড়েন।। নিজে লেখা পড়া জানিনা। তাই সন্তানদের লেখা-পড়া শিখিয়ে মানুষ করার চেষ্টা করছি।অনেক সময় মেয়েও আমার সঙ্গে কাজে সাহায্য করে। কাজের টাকা জমিয়ে গত চার বছর আগে স্বামী হবি মিয়াকে তিন লাখ টাকা খরচ করে দুবাই পাঠাইছি। আমি যাদেরকে কাজ শিখিয়েছি তাদের কারোর কাছ থেকে কোনো টাকা -পয়সা নেই না।
জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা যা বলেন : গুরুই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোঃ আবু তাহের বলেন , তার ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের নারীরা শাড়িতে কারচুপির কাজ করে একে গ্রামীণ শিল্পে পরিণত করেছেন। এ কাজে গ্রামের অশিক্ষিত ও নেয়াত গরিব , স্বামী পরিক্ত্যত মেয়েরা সম্পৃক্ত হয়ে অলস সময় বসে না থেকে শাড়িতে কারচুপির কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। অন্য দিকে অনেকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করায় দিন-দিন ওই কাজের প্রসার ঘটছে।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন , গ্রামের নারীরা শাড়িতে হাতের কাজ করে আথর্িক স্বচ্ছতা এনেছে শুনে কয়েক দিন আগে গ্রামটি ঘুরে এসেছি। সত্যি , নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না যে আমাদের দেশের গ্রামের নারীদের হস্তশিল্প এত সুন্দর। এ কাজ করে তারা সংসারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়াও শেখাচ্ছে।তাদের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। এ কাজে প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন থেকে যেকোনো সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।